যাদু-টোনা, তাবীজ-কবজ ও কুফরী-কালাম: মৌলিক করণীয় কাজ কী

যাদু-টোনা, তাবিজ-কবজ, কুফরী-কালাম ইত্যাদি সমস্যা সম্পর্কিত বিষয়ে অনেকেই আজ চিন্তিত ও পেরেশান।
বিষয়টি নাজুক। অবশ্যই সত্য যে এসব অতীব মন্দ কাজে একটি চক্র বা শ্রেণী যুক্ত ও ব্যস্ত থাকে। তারা বিভিন্নভাবে অন্যের ক্ষতি করতে চায়। আরেক শ্রেণী এগুলোর শিকার। মাঝখানে এক শ্রেণী এগুলোর চিকিৎসা দান করেন, তাদের মধ্যে নানা ধরণের চিকিৎসক — ভালো, মন্দ, বিতর্কিত, প্রশ্নবিদ্ধ অথবা সুযোগসন্ধানী।

খুব শক্ত ও মারাত্মক গুনাহসমূহের মধ্যে একটি হলো এই সেহের-যাদু করা। মানুষের ক্ষতি করাই তো এক স্বতন্ত্র বড় গুনাহ; তার উপর আবার যখন এ জাতীয় কুকর্মের আশ্রয় নেওয়া হয়, তা কুফর আর শিরকের দরজায় পৌঁছে দেয়। অনেকে মনে করে থাকে যে এসবকিছু সে ভালো নিয়্যতে বা ভালোর জন্য করছে ইত্যাদি। এ হলো শয়তানের আরেক জাল! ভালো নিয়্যতে মানুষের ক্ষতি করা তো কোনোভাবে জায়েয নেই!

যাহোক, আমাদের কী করণীয়? এ প্রশ্নের সহজ-সরল উত্তর হলো, এধরণের বিপদের পড়ার আগেই সুন্নাহ সম্মত জীবনযাপন শুরু করুন। আর যদি আল্লাহ না করুন বিপদ চলেই আসে, অবশ্যই কোনো আলেমের সঙ্গে বসুন, পরামর্শ ও নির্দেশনা নিন। তওবা করে এখন থেকে আল্লাহ তাআলার পথে ফিরে আসুন। যদি নানান চেষ্টা-তদবীর (অবশ্যই চেষ্টা-তদবীরগুলো শরীয়তসম্মত হতে হবে) করার পরও বিপদ না যায়, সমস্যা রয়ে যায় — সবর করুন, হাদীসে পাকের আমল জেনে নিন, জারি রাখুন সেগুলো। হতাশ হওয়া যাবে না। মুমিন হতাশ হয় না।

যেটা করবেন না, সেটা হলো: যত্রতত্র যেকোনো জায়গায় যাবেন না, যে কারো কাছে এসব বিপদের কথা বলবেন না, যেকোনো চিকিৎসা অবলম্বন করবেন না, যে কাউকে টাকা-পয়সা দেবেন না। অনেকক্ষেত্রে আমাদের মানসিক চিন্তা ও দুশ্চিন্তার কারণেই আমরা খুব সহজে ধরে নেই যে ‘কেউ আমাকে তাবীজ করেছে’। এ কথাটি হয়ত প্রথমে মনে মনে রাখি, পরে এটি অন্তরে বদ্ধমূল হয়, তারপর মানুষকে বলেও বেড়াই। এ জাতীয় চিন্তাকে খামাকা প্রশ্রয় দেওয়া বড় রকমের বোকামী এবং অজ্ঞতা। এতে সমস্যা কমে না, বরং বাড়ে।

যদি আপনার মনেই হয় যে আপনি যাদু-টোনার শিকার হয়েছেন, এটি অনেক সময় নিশ্চিত হওয়া যায় না। তাই মৌলিক বিষয় হলো আপনি কোনো বিপদে পড়েছেন। আর এজন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আল্লাহ তাআলার কাছে তওবা এবং ইস্তেগফার শুরু করুন। বিপদ দূর হওয়ার মহৌষধ তো এটিই! সাথে সাথে বিশ্বস্ত কাউকে ব্যাপারটি বলুন। দ্বীনদার-পরহেযগার কাউকে বলতে পারলে সবচেয়ে বেশি ভালো! আর দোআ করুন; কায়মনোবাক্যে খুব দোআ করুন যেন এ জাতীয় বিপদ থেকে আল্লাহ রক্ষা করেন। রক্ষাকারী একমাত্র আল্লাহ তাআলা, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই যত আন্তরিকতার সঙ্গে তাঁকে ডাকবেন ও তাঁর ওপর ভরসা করে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ  করবেন ততই উত্তম।

ধৈর্যহারা হবেন না! মানুষ বা জ্বীনের ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য উলামায়েকেরাম সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠের গুরুত্ব দিয়েছেন সবচেয়ে বেশি। একে তো কুরআন মাজীদের আয়াতসমূহ এগুলো, আবার এ আয়াতগুলো নাযিলে পটভূমিও যাদু-টোনা মানুষরূপী শয়তান ও শয়তান জ্বীন থেকে পানাহ চাওয়া। সূরাগুলো নাযিল কেন হয়েছে তা তাফসীরের কিতাব থেকে পড়ে নিন। সূরাগুলো ফযীলতও জেনে নিন। ফজর ও মাগরিবের পর অবশ্যই তিনবার করে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাকসূরা নাস পড়বেন (হাদীসে বর্ণিত সুরক্ষাকারী আমল — সমস্ত সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে সুরক্ষাকারী)। জুম্মাবারে সূরা কাহাফ পড়ুন (হাদীসে বর্ণিত সুরক্ষাকারী আমল — সব ফেতনা থেকে — একেবারে দজ্জাল পর্যন্ত, যা সবচেয়ে কঠিন ফেতনা)। প্রতিদিন সূরা কাহাফের প্রথম দশ আয়াত পড়ুন (এটিও দজ্জাল ও অন্যান্য ফেতনা থেকে রক্ষাকারী আমল)। রাতে ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসীসূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়ুন (সুরক্ষার জন্য হাদীসের বর্ণিত আমলসমূহ)। ঘুমানোর আগে এই নিয়মে তিনবার করে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাকসূরা নাস পড়ুন (হাদীসে পাকে বর্ণিত আমল): প্রথমে ১বার করে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাস; ..এভাবে ২য় দফা ১বার করে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাস; শেষে অর্থাৎ, ৩য় দফা ১বার করে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাস; এ নিয়মে তিনবার সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাস পড়ার পর দুই হাতের তালুতে হালকা থুথু ছিটাসহ ফুঁ দিন, সারা শরীরে সাধ্যমতন হাতের তালু ফিরিয়ে নিন — এ নিয়মে শরীর (সব মন্দ বিষয় থেকে) বন্ধ করে আল্লাহর নাম নিয়ে রাতে ঘুমান।

কোনো কারণে মন প্রশান্ত না হলে, অস্বস্তি বোধ করলে, কোনো অনাকাঙিখত ঘটনা বার বার অনুভব করলে, খুব বেশি খারাপ অভিজ্ঞতা বার বার হতে থাকলে অথবা খারাপ কোনো স্বপ্নের দ্বারা বার বার ভীত হলে আপনি নিকটস্থ কোনো আলেমের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি খুলে বলুন। তার পরামর্শ ও নির্দেশনা চান। আর আল্লাহ তাআলার কাছে সাহায্য চান যেন কোনো শঠ, প্রতারক বা সুযোগসন্ধানী কেউ যেন আপনার ক্ষতি করতে না পারে। ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তাআলা আপন কুদরতে আপনার জন্য কোনো সুপথ খুলে দেবেন। তাঁর প্রতি পুরোপুরি ভরসা রেখে চেষ্টা করবেন।

একটি কথা না বললেই নয়! গুনাহর মধ্যে নিমজ্জিত থেকে মুসলমান আজ নানান বিপদে জর্জরিত। গুনাহ থেকে তওবা করলেই তো এসব আমলগুলোর স্থায়ী ও আমল ফায়দা পাওয়া সম্ভব। যদি একবারে সব গুনাহ নাও ছাড়া যায়, আজই গুনাহ ছাড়ার চেষ্টা শুরু করুন আর আমলগুলোও করুন। দেখবেন ইনশাআল্লাহ ফায়দা পাবেন। ঈমানদার হতাশ হবে না। মূল সমস্যা আমরা নিজেরা, আমাদোর গুনাহ। সংশোধনের জীবন গ্রহণ করতে হবে। কেউ নিজেকে কবুল-মকবুল বলার অধিকার রাখি না আমরা। কেউই দাবী করতে পারি না যে, আমার আমলগুলি গ্রহণের খুব যোগ্য। বরং হাজার হাজার ত্রুটিযুক্ত আমরা সবাই। জেনে হোক বা না জেনে, আল্লাহ তাআলার নারাজি আর নাফরমানিতে আমরা লিপ্ত। যারা আল্লাহর পথে চলছি বলে খুব মনে করি, তাদেরও নানান আত্মিক রোগ আছে, এদিকে দৃষ্টিপাত করা ও সংশোধনের চেষ্টা করা জরুরি। মোদ্দা  কথা, কেউ যেন নিজ অবস্থায় খুব সন্তুষ্ট না হয়ে যাই! অবশ্যই আল্লাহ তাআলার রহমতের আশা রাখব, আবার তাঁকে ভয়ও করব। চিন্তিত হবো যে, কোন্ গুনাহর কারণে আমার এসব বিপদ(?!) হঠকারীমূলক এ জাতীয় চিন্তাকে ঠাঁই দেব না, যেমন, আমি তো ভালো মানুষ, আমার কেন এমন বিপদ?! এ জাতীয় কথার মাধ্যমে আমরা কি আল্লাহ পাককে দোষারোপ করি না?! নাউযুবিল্লাহ।

আর মনে রাখত হবে: মুমিনের বিপদ তো রহমতও! পরীক্ষা, রহমত, গুনাহ মাফ, দুনিয়াতেই পাপের শাস্তি — সব তো ঈমানদারদের জন্যই!

অবশ্যই আমরা সবরকম বিপদাপদ থেকে আল্লাহ তাআলার আশ্রয় চাই। সেজন্যই তো জীবনটিকে পবিত্র সুন্নাহ দিয়ে সাজাতে হবে! প্রিয় নবীজি ﷺ এর সুন্নতগুলো আজ আমাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন থেকে একদম বেরিয়েই গেছে যেন! কত দুর্ভাগ্যের কথা এটা। শুধু বিপদ আসলেই আজ হাহাকার করি আমরা। অথচ বিপথে ও মনমত চলার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল ﷺ কতবার, কতভাবে সতর্ক করেছেন আমাদেরকে!

আসুন আমরা খাঁটিভাবে তওবা করি। ভালো সঙ্গ অবলম্বন করি। দ্বীনকে সঠিকভাবে জানি ও শেখার চেষ্টা করি। বিপদ যাঁর হুকুম ছাড়া আসতে পারেনি, তিনিই বাঁচাবেন আমাদের ইনশাআল্লাহ! তাঁর পথে সাধ্যমতন চলা আর দোআ করাই বান্দার কাজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *