Dark Mode Light Mode

ভূমিকম্প ও বিপদাপদ: সতর্কবাণী যেন আল্লাহ অভিমুখী হই – ৩

মুসলমান ও কাফেরের কাজে বাস্তবে পার্থক্য বিদ্যমান

আমরা আমাদের আলোচনার এক পর্যায়ে (প্রবন্ধের প্রথম কিস্তিতে) প্রশ্ন করেছি: ভূমিকম্প পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় মুসলমানরাও তো দৌঁড়ে বাসা থেকে বের হয়, তাদেরও চিন্তা বিল্ডিং মজবুত করে নির্মাণ করা দরকার..ইত্যাদি। তাহলে মুসলমান ও কাফের-এর বিশ্বাসে আবার পার্থক্য থাকল কোথায়?!

সেই জবাবের বৃহত্তর অংশ কিন্তু মাত্র দেওয়া হল। তারপরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের আলোচনা বাকি। কারণ, ঈমানদারের আমল অর্থাৎ কাজ আর কাফেরের কাজ দেখতে একরকম হলেও তা এক নয়। বিশ্বাসে যার ঈমান আর বিশ্বাসে যার ঈমান নয় — এই দুই পক্ষের কাজের ধরণে অবশ্যই পার্থক্য হয়ে থাকে। কাজ একই হলেও ধরণ কখনও একরকম না। কোনো না কোনো পার্থক্য থাকেই। যদি কখনোই কোনো পার্থক্য না থাকে তাহলে তো উভয়ের অবস্থা বরাবর হয়ে গেল (নাউযবিল্লাহ)! এতে কাফেরের কিছু যায় আসতে না পারে, মুমিনের ঈমান তো প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়! আমার পরা, খাওয়া, ঘুম, জরুরত-খায়েশাত পূর্ণ করার মতন কাজ পর্যন্ত আল্লাহর আদেশ নিষেধ অনুযায়ী হয়, কারণ আমি ঈমানদার। কিভাবে আমার এসব কাজের সবকিছু কাফেরের সাথে মিলবে?! তা কখনো হতে পারে না।

এখন যদি আমরা প্রত্যেককে এ কথা জিজ্ঞেস করি: ভূমিকম্পের কারণে অস্থির হয়ে দৌঁড়ে বাড়ির বাইরে বের হওয়ার সময় আমার ঈমান কোথায় ছিল??! যদি বলি, ঈমান ঠিকই ছিল — তাহলে নিজেকে ফের প্রশ্ন করি, সেটির প্রতিফলন আমার আমলে কেমন ছিল?! ঈমানের প্রতিফলন তো আমল। ঈমান তো আমল বা কাজের মাধ্যমেই প্রকাশ পেয়ে থাকে।

ঐযে তখন আমাদের সাধারণভাবে যে জবাব বা যুক্তি: আল্লাহ তো চেষ্টা করতে বলেছেন। আমরা কি বাঁচার চেষ্টা করব না?! হাঁ, খুব সুন্দর যুক্তি। বলছি না “এমন করা যাবে না”, কিন্তু ভাই! ঠিক কোন্ চেষ্টায় ভূমিকম্প থেকে বাঁচতে চেষ্টা করছেন — যুক্তির আলোকেই জানতে চাচ্ছি!

বিল্ডিং-এর ভেতর থেকে বের হলে অন্য বিল্ডিং আমার-আপনার মাথার উপর পড়বে না — এমন কোনো নিশ্চিত খবর কি পেয়েছি আমরা কেউ? আরও আশ্চর্য হল, যেই অস্থিরতা ও গতিবেগে আমরা বাসা-বাড়ি থেকে দৌঁড়ে বের হওয়ার চেষ্টা করি — সেটা কি একজন মুমিনের শানের (মর্যাদার) সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ!?

আহা আমরাই অবশ্য (আল্লাহ পাকের অশেষ রহমতে) মুসলমান!

সাইয়্যেদুনা আলী ইবনে আবী তালিব রাদিআল্লাহু আনহুকে কেউ জঙ্গে সিফ্ফীনে নিজ বাহনে তন্দ্রাচ্ছন্ন দেখে বলেছিল, আপনি এত ভয়ংকর যুদ্ধের মাঝে আবার তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে যান??! তিনি কি চমৎকার কথাটিই না বলেছিলেন!! “তুমি আমাকে বলে দাও, কোন্ দিন আমি মৃত্যু থেকে পালাব, যেদিন মৃত্যু আসবে না, নাকি যেদিন আমার মৃত্যু আসবে?” সুবহানআল্লাহ! এটিই হল, ঈমানের দৃঢ়তা।

নিজের ঈমান যাচাই ও তওবা করা প্রয়োজন

কিন্তু দুঃখজনক হল, আজ আমাদের মুখে তো আল্লাহর নাম আছে, সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবীর উম্মত হিসেবে আমরা গৌরবান্বিতও। কিন্তু আমাদের অধিকাংশ কাজ, চেষ্টা ও অবস্থা বার্তা দিচ্ছে অন্য।

অবশ্যই ভূমিকম্প কোনো সাধারণ ঘটনা নয়! আল্লাহ তাআলা এই কঠিন আযাব দ্বারা পূর্ববর্তী কত জাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এখনও কোথাও বেশি মাত্রার ভূমিকম্প কিভাবে বিশাল বিশাল অট্টালিকা দুমড়ে-থুবড়ে ফেলে দেয়! আল্লাহ মাফ করুন…কী ভয়ানক..! কিন্তু এর মূল কারণের দিকে লক্ষ করার অভাব আমাদের মাঝে ব্যাপক। আমাদের কার্যকলাপ ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এর জ্বলজ্যান্ত সাক্ষী।

মুসলিম ও অমুসলিমের চিন্তার পার্থক্য কাজেও পার্থক্য করে দেয়। আজ মুসলিমদের চিন্তার শিড়ায় অমুসলিমদের চিন্তা ঢুকতে শুরু করেছে বলেই মুসলিমদের কাজ অমুসলিমদের মতন হয়ে যাচ্ছে! এটার দ্রুত নিরাময় ও সংশোধন জরুরি।

একজন মুসলিম ভূমিকম্প কিংবা যেকোনো বিপদ ও আযাবের পূর্ব-প্রস্তুতি হিসেবে আল্লাহর দিকে রজু’ হওয়াকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেবে। আনুষঙ্গিক চেষ্টা-তদবিরগুলো সবই হবে আল্লাহ যেভাবে চান সেভাবে। আল্লাহকে ভুলে গিয়ে, তাঁর অবাধ্যতা জারি রেখে (অর্থাৎ গুনাহর বিষয়ে কোনো পরোয়া না করে) আবার কেমন সাবধান-সতর্কতা?! আল্লাহ না করুন বিপদ যদি চলেই আসে তাহলে মুমিন অস্থির হবে না। মৃত্যু হয়ে গেলে ইনশাআল্লাহ তার জন্য সর্বাবস্থায় রহমতের ফয়সালা হবে। হায়াত থাকলে আরও বেশি আল্লাহ-মুখী হয়ে জীবনযাপন করবে। বর্জনীয় কাজ (গুনাহ) থেকে বিরত থাকবে। অবধারিত মৃত্যু থেকে পালাবার পথ কারু নেই। মৃত্যু তো বরণ করার বিষয়, প্রতিরোধ করার বা পালাবার নয়! মৃত্যু আল্লাহরই একটি হুকুম — প্রত্যেককে গ্রহণ করতে হবে — এ ব্যাপারে কোনো এখতিয়ার নেই যে, আজ মরবে নাকি কাল!

আমরা আবারও একেবারে শুরুতে উল্লেখিত আয়াতেটি দিয়ে শেষ করছি (তা এজন্য যেন আমরা আয়াতের ওপর গভীর চিন্তা করে সতর্ক হই!); সূরা রূমে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

ظَهَرَ ٱلْفَسَادُ فِى ٱلْبَرِّ وَٱلْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِى ٱلنَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ ٱلَّذِى عَمِلُوا۟ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ

অর্থ: মানুষের নিজ হাতে কৃত কাজের কারণে স্থলে ও জলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে, যেন আল্লাহ তাদেরকে তাদের (মন্দ) কাজের কিছুটা স্বাদ আস্বাদন করান, যাতে তারা তা (সেই গুনাহ) থেকে (সঠিক পথে) ফিরে আসে। সূরা রূম – ৩০:৪১

প্রিয় নবীজী ﷺ বুদ্ধিমান তাকে বলেছেন যে কিনা মৃত্যু আসার পূর্বে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। আমরা কি এমন হতে পারি না? আল্লাহ তাআলা তাওফীক দিন (আমীন)।


আমাদের সকল আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!

By pressing the Subscribe button, you confirm that you have read and are agreeing to our Privacy Policy and Terms of Use
Add a comment Add a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous Post

খ্রিস্টান পাদ্রীর জঘন্য মনোভাবসম্বলিত এক প্রশ্নের বিরুদ্ধে চমৎকার জবাব