২৭তম তারাবীহ: ৩০তম পারার মর্মার্থ

সূরা নাবা
মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত চল্লিশ, রুকু দুই
সূরার মূল আলোচ্য বিষয় মৃত্যু পরবর্তী জীবন ও পুনরুত্থান। সূরার সূচনায় মুশরিকদের সেই জিজ্ঞাসার উল্লেখ রয়েছে যা তারা ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করে কিয়ামতের ব্যাপারে করতÑ “এরা নিজেরদর মধ্যে কী বিষয়ে জিজ্ঞাসা করছে, সেই বিরাট সংবাদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছে যে ব্যাপারে তাদের বিভিন্ন মত রয়েছে।” (১-৩) অর্থাৎ কেউ কেয়ামতকে স্বীকার করে, কেউ অস্বীকার, কেউ করে ঠাট্টা-বিদ্রƒপ, কেই আবার সন্দেহের শিকার। হযরত মুজাহিদ রহ. এর মতে, আয়াতে উল্লেখিত ‘নাবা আজীম’ দ্বারা কুরআন কারীম উদ্দেশ্য। এতে তো কোনো সন্দেহ নেই যে, সবচেয়ে বড় সংবাদ এবং সবচেয়ে বড় কালাম হলো আল্লাহর কালাম কুরআন কারীম। অবশ্য সূরার অন্যান্য আয়াতগুলোর প্রতি লক্ষ্য করলে বুঝা যায়, এখানে ‘নাবা আজীম’ দ্বারা কেয়ামত উদ্দেশ্য।
পরবর্তী আয়াতগুলোতে ঐশী কুদরতের দলীল ও প্রমাণ, কেয়ামতের বিভিন্ন দৃশ্য এবং জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনা রয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে, তিনিই আল্লাহ যিনি যমীনকে বানিয়েছেন বিছানা, পাহাড়-পর্বতকে বানিয়েছেন পেরেক। মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জোড়ায় জোড়ায়, নিদ্রাকে করেছেন ক্লান্তি দূর করার এবং শান্তি অর্জনের মাধ্যম, রাতকে করেছেন আচ্ছাদন, দিনকে করেছেন জীবিকা উপার্জনের মাধ্যম আর আসমানে তৈরি করে রেখেছেন সারা বিশ্ব উজ্জ্বলকারী চেরাগ ও প্রদীপ। (৬Ñ১৬) তিনিই পুনরায় জীবন দান করতে পারেন, পারেন পূর্ব-পরের সকলকে একত্র করে এমন আদালত বানাতে যেখানে শুধুই ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা হবে। (১৭)
হিসাব নিকাশ এবং ন্যায় ও ইনসাফের পর কারো ঠিকানা হবে জান্নাত। কারো হবে জাহান্নাম। (২১Ñ৩৭)
সূরার শেষে বলা হচ্ছে, কেয়ামতের দিন সত্য, এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। যদিও আল্লাহ তায়ালা রহমান এবং অত্যন্ত মেহেরবান, কিন্তু সেদিন তাঁর সামনে তার অনুমতি ছাড়া কেউ কথা বলতে পারবে না। সেদিন প্রত্যেককে তার আমলনামা দিয়ে দেয়া হবে এবং প্রত্যেককেই তার সিদ্ধান্ত শুনিয়ে দেয়া হবে। সিদ্ধান্ত শুনে কাফের এ আকাংখা করবে, হায়! যদি আমি মাটিই হয়ে যেতাম। (৩৯Ñ৪০)
‘মাটি হওয়ার’ একটি অর্থ হলো, যদি আমার সৃষ্টিই না হতো। দ্বিতীয় অর্থ হলো, আমি যদি অহংকার না করতাম এবং মাটির মত অসহায়ত্ব ও অক্ষমতা অবলম্বন করতাম। তৃতীয় অর্থ হলো, আমি যদি মানুষ না হয়ে পশু হয়ে জন্মাতাম আর পশুকে যেভাবে পুনরায় জীবন দানের পর মাটি বানিয়ে ফেলা হবেÑ আমার অবস্থায়ও যদি তাই হত। আর এভাবে যদি জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পেতে পারতাম। (আল্লাহ সবাইকে হেফাজত করুন। আমীন)
সূরা নাযিআত
মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত ছিচল্লিশ, রুকু দুই
এ সূরাতেও কেয়ামতের বিভিন্ন অবস্থা ও ভয়াবহতার বিবরণ রয়েছে। সূচনায় আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত পাঁচ ধরনের ফিরিশতাদের শপথ করেছেন। কিন্তু কি বিষয়ে শপথ তা উল্লেখ না থাকলেও পূর্বাপর বলে দিচ্ছে, এখানে উহ্য বাক্যটি হলো, “কেয়ামতের দিন অবশ্যই তোমাদেরকে যিন্দা করা হবে।” (১-৫)
সূরা নাযিআত বলে, যারা কিয়ামতের দিনকে অস্বীকার করে সেদিন তাদের আত্মা দুরু দুরু করে কাঁপতে থাকবে। ভয়-ভীতি এবং লজ্জা ও লাঞ্চনায় তাদের দৃষ্টি নীচু হয়ে যাবে। (৬Ñ৯) কিন্তু দুনিয়ায় আজ তারা ফিরআউন বনে গেছে, আল্লাহর নবীর কথা মানতে তারা প্রস্তুত নয়, কিন্তু সম্ভবত তারা জানে না, কি হয়েছিল ফিরআউনের শেষ পরিণতি। (১৫Ñ২৬)
বুদ্ধিহীন এই নির্বোধেরা এ কথা ভেবে দেখে না, যে আল্লাহ মজবুত আসমান তৈরি করতে পারেন, রাতের অন্ধকার ও দিনের আলো সৃষ্টি করতে পারেন, যমীনের বিছানা বিছিয়ে দিতে পারেন, পাহাড়ের পেরেক গাড়তে পারেন, তিনি কি আবার যিন্দা করতে পারবেন না? (২৭Ñ৩৩)
কিয়ামতকে অসম্ভ ভেবে মুশরিকরা যে প্রশ্ন করত সূরার শেষে তা উল্লেখের পর বলা হচ্ছে, যেদিন তারা এই কেয়ামত দেখে ফেলবে সেদিন তারা মনে করতে থাকবে, দুনিয়ায় তারা এক সকাল বা এক বিকালই অবস্থান করেছে।
সূরা আবাসা
মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত ছিচল্লিশ, রুকু এক
এই সূরার সূচনায় অন্ধ সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ বিন উম্মে মাকতুম রা. এর একটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। একবার হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কার কুরাইশ প্রধানদেরকে দ্বীন ইসলামের প্রতি আহ্বান করছিলেন। এমন সময় এই নিরীহ অন্ধ সাহাবী এসে নবীজীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ওগো আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আপনাকে যেভাবে শিখিয়েছেন সেভাবে আমাকে অমুক আয়াতটি শিখিয়ে দিন। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত, বিশেষ করে যাদেরকে হিদায়াতের দাওয়াত দিচ্ছেন তাদের একজনও যদি হিদায়াত পেয়ে যায় তবে তাদের অনুসরণে রয়েছে বহু লোকের ইসলাম গ্রহণের বিপুল সম্ভাবনা ।
আর এদিকে আব্দুল্লাহ রা. এর এই জিজ্ঞাসার কারণে নবীজীর চেহারায় বিরক্তি ফুটে ওঠে। হুযুরের এই বিরক্তি কিন্তু আল্লাহর পছন্দ হয় নি। তাই হুযুরকে এই প্রসঙ্গে সস্নেহে ভর্ৎসনা করে এই আয়াতগুলো নাযিল হয়। অতঃপর যখনই হযরত আব্দুল্লাহ রা. হুযুরের কাছে আসতেনÑ হুযুর বলতেন, যার ব্যাপারে আমার রব আমাকে ভর্ৎসনা করেছেন তাকে সাদর সম্ভাষণ। অন্ধ হওয়া সত্ত্বেও নবীজী এই সাহাবীকে দুই দুটি যুদ্ধের সময় মদীনার গভর্নর বানিয়েছিলেন।
কুরআন শরীফে এ ধরনের ঘটনার উল্লেখ মূলত কুরআনের সত্যতাকেই প্রমাণ করে। যদি এটা নবীজীর বানানো কোন কিতাব হত তবে নবীজীকে ভর্ৎসনা করা হয়েছে এমন কোনো ঘটনার উল্লেখ তাতে থাকত না। হযরত ইবনে উম্মে মাকতুমের এ ঘটনার উল্লেখের পর সূরাটি মানুষের অকৃতজ্ঞতার বর্ণনা দিচ্ছে। আসলে মানুষ নিজের মূলকে ভুলে যাওয়ার কারণেই এ ধরনের অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়। (১৭Ñ২০)
এরপর আল্লাহ তাআলার একত্ববাদের বাহ্যিক কিছু প্রমাণ উল্লেখ করে সূরার শেষে কিয়ামতের একটি ভয়াবহ চিত্রের অংকন করা হয়েছেÑ সেদিন মানুষ ভয়ে নিজের নিকটাত্মীয়কেও ভুলে যাবে, সকলেই নিজের চিন্তায় বিভোর হয়ে থাকবে, অন্যের জন্য কিছু ভাবার কল্পনাও করতে পারবে না, তবে সে দিন কারো কারো চেহারা আনন্দে উদ্ভাসিতও হবে, সাফল্যের বিজয় গাঁথা তাদের চেহারা উজ্জ্বল করে দিবে। পক্ষান্তরে অনেক চেহারা সেদিন ধূলোমলিন থাকবে, ব্যর্থতার গ্লানি ও লাঞ্ছনা তাদের চেহারায় ছেয়ে থাকবে। (৩৩Ñ৪২)

পুরো পড়তে ক্লিক করুন: ৩০তম পারা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *