হজ্জ: ৩

শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রহ.-এর একটি কথা খুব স্মরণযোগ্য। ইসলামে দুটি জিনিস বিস্ময়কর। একটি নিয়্যত, অপরটি হল তওবা। হযরতের কথাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ দু’টিই এমন বিষয় যার সুফল ব্যাপক ও বিস্তৃত। অথচ চিন্তা করুন, দু’টি আমলই সহজ। আবার এই দুটির একটির অভাব ও অবহেলার ফলে যে ক্ষতি, তাও অনেক বেশি। এর কোনটির ইতিবাচক দিক যেমনি একজন নিশ্চিত জাহান্নামের পথের পথিককে জান্নাতিতে পরিণত করে, এর যেকোনটির চাহিদার বিপরীত আমল ক্ষতি আর ক্ষতিই বয়ে আনে। জান্নাতের পথের পথিক একদম জাহান্নামের পথে চলে যায়! আল্লাহ তাআলা আমাদের রক্ষা করুন। আমীন।

তওবাতো একজন মুমিন সারাজীবনই অত্যন্ত যত্নের সাথে করবে। হজ্জে যাওয়ার পূর্বে তওবার কথা বিশেষভাবে বলা হচ্ছে কারণ, আল্লাহ তাআলার শাহী দরবারে হাজির হওয়ার পূর্বেই তওবা করে নিলে বান্দা আরো অধিক ফায়দা পাবে, এটাই স্বাভাবিক। এমন হজ্জ, যা কিনা মুমিনের জীবন-মোড়কে আল্লাহ-মুখী করবে সেই হজ্জই মুমিনের কাম্য। তাই একেবারে শুরু থেকেই তওবা-ইস্তেগফার করে নেয়া উচিত। মুমিনকে আল্লাহ তাআলার পথে দ্রুত অগ্রসর হতে তা বিশেষ সহায়ক হবে। ইনশাআল্লাহ এই তওবা হজ্জে মাবরুর তথা মকবুল হজ্জের পথ সুগম করবে।

গুনাহ্ ছেড়ে দেয়া বা গুনাহ্ না করার পাকা ওয়াদা করা, আন্তরিক ভাবে লজ্জিত হওয়া, অনুশোচনা করা – এই তিনটি হল তওবার মৌলিক শর্ত। যে যেই গুনাহে অভ্যস্ত সেই গুনাহ্ ছাড়তে হবে। কেউ গান-বাজনা শুনায় অভ্যস্ত, কেউ সুদ-ঘুষের সাথে সংশ্লিষ্ট, কেউ বা মিথ্যা কথা বলে, কেউ গীবত করে, কেউ বা শুধু ঝগড়া করে, কেউ মা-বাবার নাফরমানি করে, তাদের সাথে বেআদবি করে, স্বামী স্ত্রীর সাথে – স্ত্রী স্বামীর সাথে অন্যায় আচরণ করে। সব গুনাহ্ থেকেই মুমিন তওবা করবে। হ্যাঁ, গুনাহ্-র লিস্ট যতই লম্বা হোক, গুনাহ্ যত বেশীই হোক, তার চেয়ে আল্লাহ তাআলার রহমত বহু গুণ বেশি। বরং, আল্লাহ তাআলার রহমত তো অসীম!

জ্বী, এক এক করে হলেও গুনাহ্ পরিত্যাগের প্রচেষ্টা – এই এখন থেকেই করব। খুব শীঘ্রই মৃত্যু আমাকে গুনাহ্ থেকে পৃথক করবেই। তার আগেই আমি গুনাহ্ থেকে পৃথক হয়ে যাব। আর গুনাহ্ করব না, আর আল্লাহ তাআলার নাফরমানি করব না। এভাবে পাকা এরাদা করব। আল্লাহ তাআলার কাছে আবেদন এই হবে যে, হে আল্লাহ! তোমার উপর ভরসা করে আমি এই ওয়াদা করছি। তুমি এই তওবার উপর স্থির থাকতে আমাকে সাহায্য কর। মনে রাখতে হবে, এই ওয়াদা খাঁটি ভাবেই হতে হবে। তওবা করার সময় “আবার গুনাহ্ করব” এই চিন্তা কোনভাবেই স্থান দেয়া যাবে না। আমরা নিজের নফসের উপর ভরসা করে তো এই ওয়াদা এজন্যই করছি না যে, নিজ পদস্খলনের আশঙ্কা তো আছেই। কিন্তু পদস্খলনের নিয়্যত থাকা তো কোন ভাবেই যাবে না! সেজন্যই তো সব ভরসা আল্লাহ তাআলার উপর স্থাপন করা হচ্ছে। আর এর অর্থ এ কখনোই নয় যে, আমার গুনাহ্ ছাড়ার প্রচেষ্টা বন্ধ। বরং আমার সাধ্যে যা আছে তা করেই আল্লাহ তাআলার প্রতি পূর্ণ ভরসা করছি। এরূপ চেষ্টার ফলে তিনিই আপন রহমতে আমাকে গুনাহ্ থেকে বাঁচাবেন, তা না হলে কোনভাবেই আমি বাঁচব না।

এখন দুটি বিষয়। এক তো আল্লাহ তাআলার হক। আরেক হল বান্দার হক। নামায, রোযা ইত্যাদির তো কাযা যথাসম্ভব আদায় শুরু করতে হবে। আর কুরবানী, যাকাত ইত্যাদিতে অবহেলা করে থাকলে যথাসম্ভব তাও আদায় করতে হবে। এই মাসআলা প্রত্যেকে আলেম থেকে জেনে নেবে। বান্দার হক খুব স্পর্শ কাতর বিষয়। বান্দার হক নষ্ট করে আমি যদি হজ্জে গিয়ে কাবার গিলাফ ধরেও শত কান্নাকাটি জুড়ে দিই, কী ফায়দা?! কারো গীবত করেছি, কারো থেকে ঘুষ নিয়েছি, কারো সম্পত্তি লুটেছি – যথাসম্ভব এগুলোর ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

মুমিন তওবার সময় ক্ষতিপূরণ দিতে ঘাবড়ে যাবে না। তার সামনে কবর ও হাশরের চিত্র ভেসে উঠবে। সে জানে আল্লাহ তাআলার সামনে দাঁড়ানো এর চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ! আর বাস্তবে তওবাকারী যখন খালেস আল্লাহ তাআলার ভয়ে তওবা করতে শুরু করবে, তাঁর সাহায্য তওবাকারীর পক্ষে হবে। বান্দা আল্লাহ তাআলার পথে অগ্রসরের চেষ্টায় রত থাকবে, আর আল্লাহ তাকে সাহায্য করবে না, এমন কখনো হবে না। বরং ইতিহাসে এবং বর্তমানেও শত শত, বরং হাজার হাজার ঘটনা আমাদের সামনে রয়েছে, তওবার মাধ্যমে মুমিন সংশোধন, উন্নতি ও সম্মানের অনেক উঁচু স্তরের জীবন অর্জন করেছে আলহামদুল্লিাহ!

কোন মুহাক্কিক আলেমকে নিজের অবস্থা উল্লেখ করে বান্দার হক সংক্রান্ত তওবার নিয়মও জেনে নিতে হবে। এক্ষেত্রে সবার অবস্থা ও (কোন কোন) মাস’আলা সমান নয়।

তওবা করে, বা অন্তত তওবা শুরু করে পবিত্র হজ্জে রওনা হলে যে আত্মিক উন্নতি, ইবাদতের স্বাদ, অনাবিল আনন্দ অনুভূত হবে তা অবর্ণনীয়। ইনশাআল্লাহ এই পদক্ষেপই হজ্জে মাবরুর নসীব করে দেবে!

Leave a Reply

Your email address will not be published.