সালাতুত তাসবীহ – একটি বিস্ময়কর আমল

প্রিয় পাঠক, লক্ষ করুন: এই প্রবন্ধের একদম শেষে সালাতুত তাসবীহ পড়ার নিয়মটি pdf আকারে দেওয়া আছে। আপনারা ডাউনলোড করে নিতে পারবেন।

ঈমানদার তার জীবনটিকে আল্লাহ তাআলার রাহে কুরবান করতে চায়.. সেই সুযোগই আল্লাহ তাআলা করে দিয়েছেন আমাদের জন্য। সুযোগ করে মুমিন নেক আমল করে আখেরাতের পুঁজিকে সমৃদ্ধ করতে পারে। ভিডিওটি আমল করার নিয়্যতে মনোযোগ দিয়ে দেখুন। জীবনে একবার হলেও এই আমলটি করবেন ইনশাআল্লাহ!

সালাতুত তাসবীহের গুরুত্ব:

সালাতুত তাসবীহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ একটি নফল নামায। রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর একাধিক হাদীস সূত্রে সালাতুত তাসবীহের কথা উল্লেখ আছে। তাই যুগ যুগ ধরে ফুকাহাকেরাম, মুহাদ্দিসীনগণ, উলামায়েকেরাম ও আল্লাহওয়ালাগণ এ নামাযটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পড়ে থাকেন।

সাইয়্যেদুনা আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ -আমাকে বললেন,

(অর্থ), “ও আব্বাস! আমি কি আপনাকে উপহার দেব না? আমি কি আপনাকে অর্পণ করব না? আমি কি আপনাকে জানাব না তা – যা আপনি আমল করলে আল্লাহ তাআলা আপনার গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন, হোক পুরানো বা নতুন, ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত, ছোট বা বড়, প্রকাশ্য অথবা গোপন (অর্থাৎ, সব গুনাহ)। তারপর রাসূলুল্লাহ ﷺ -আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সালাতুত তাসবীহের নিয়ম বলে দিয়ে বললেন, যদি সম্ভব হয় প্রতিদিন একবার, না হলে প্রতি সপ্তাহে জুম্মাবার, বা প্রতি মাসে একবার, না হলে বছরে একবার, আর তাও না হলে, অন্তত জীবনের একটি বার তা পড়বেন।” আবু দাউদ

সালাতুত তাসবীহ সংক্রান্ত হাদীস:

ইমাম হাকেম রাহিমাহুল্লাহ থেকে এ সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, সাহাবাদের পর থেকে নিয়ে সব পূর্বসূরীগণ এ নামায পড়তেন এবং অন্যদের উৎসাহ দিতেন। ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহের উস্তাদ শায়খ আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রাহিমাহুল্লাহ. এমনকি তারও পূর্বে ইমাম বায়হাকী রাহিমাহুল্লাহ; এছাড়া ইমাম আবুল জাওযা রাহিমাহুল্লাহ (ইনি একজন তাবেঈ) প্রতিদিন সালাতুত তাসবীহ পড়তেন। উনি যোহরের আযান শোনামাত্রই মসজিদে চলে যেতেন ও যোহরের নামাযের আগেই সালাতুত তাসবীহ পড়ে নিতেন।

ইমাম আবদুল আযীয ইবনে আবি রাউওয়াদ রাহিমাহুল্লাহ যিনি ইবনে মুবারক রাহিমাহুল্লাহের উস্তাদ ও অনেক বড় মাপের একজন আল্লাহওয়ালা ছিলেন, বলেছেন, “যে কিনা জান্নাতের আকাঙ্ক্ষী, সে যেন সবসময় সালাতুত তাসবীহ পড়ে।”

আল্লামা তাকীউদ্দীন সুবকি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন যে, “এ নামাযটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং কেউ যেন কিছু মানুষের কথায় বিভ্রান্ত হয়ে তার গুরুত্বকে হালকা মনে না করে। যে কিনা এত নেকির কথা জেনেও এ জাতীয় আমলে অবহেলা করে সে দ্বীনি বিষয়ে অবহেলাকারী, সে নেককার মানুষদের মত আমলে ব্যর্থ এবং সে বিশ্বস্তদের মধ্যে গণ্য নয়।”

সাইয়্যেদুনা আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে  তিনি প্রতি জুম্মাবারে (অর্থাৎ, শুক্রবারে) সালাতুত তাসবীহ পড়তেন। গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ রাতগুলোতে এ নামায পড়া মুস্তাহাব।

হাদীসের মূলনীতি অনুযায়ী সালাতুত তাসবীহের হাদীস ‘হাসান’। এ নামাযটির গুরুত্ব অপরিসীম বলে আমরা তা পড়তে অবহেলা না করি!

সালাতুত তাসবীহ পড়ার নিয়মঃ

ইমাম আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রাহিমাহুল্লাহ এবং বহু উলামা সালাতুত-তাসবীহের নিম্নোক্ত নিয়মটি বর্ণনা করেছেন। এটি রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণিত নিয়ম।

১। প্রথমে সানা পড়ুন এবং সূরা ফাতিহা পড়ার আগে নিচের কালিমাগুলো পড়ুন (যা তৃতীয় কালেমা বলে পরিচিত):

(পনের বার পড়ুন )   سبحان الله والحمد لله ولا اله الا الله والله اكبر

          [সুবহানআল্লাহ ওয়াল হামদুলিল্লাহ ওয়া লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার]

২। তারপর ..اَعُوْذُ এবং ..بِسْمِ اللَّهِ‎ পড়ে সূরা ফাতিহা পড়ুন এবং যেকোনো সূরা মিলিয়ে পড়ুন, তারপর ঐ একই কালিমাগুলো দশবার পড়ুন, তারপর রুকুতে যান।

৩। রুকুতে গিয়ে আবার দশবার ঐ কালিমাগুলো পড়ুন। আবার রুকু থেকে দাঁড়িয়ে দশবার পড়ুন।

৪। তারপর প্রতি সেজদায় দশবার পড়ুন এবং দুই সেজদার মাঝখানে বসা অবস্থায় দশবার পড়ুন।

পুরো চার রাকআত নামায এ নিয়মেই পড়তে হবে। অতএব প্রতি রাকআতে ৭৫ বার তাসবীহ পড়তে হবে এবং চার রাকআতে ৩০০ বার পড়া হবে। (তিরমিযী)

সালাতুত তাসবীহ পড়ার জন্য সূরা ফাতিহার সাথে কোনো নির্দিষ্ট সূরা পড়ার কথা উল্লেখ নেই। যেকোনো সূরা পড়া যায়। সাইয়্যেদুনা আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “সূরা তাকাসুর, সূরা আসর, সূরা কাফিরূন, সূরা ইখলাস।” কোনো কোনো আলেম বলেছেন, সূরা হাদীদ, সূরা হাশর, সূরা সাফ্ এবং সূরা তাগাবুন। (রাদ্দুল মুহতার) 

সালাতুত তাসবীহ – কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ঃ

সালাতুত তাসবীহ পড়ার আগে সালাতটি আদায় সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখুন

ক) মুখে মুখে গণনা করে তাসবীহের হিসাব রাখা যাবে না, কারণ তা নামায ভেঙে দেবে। হাতের আঙুলকে চাপ দিয়ে হিসাব করা যাবে। (রাদ্দুল মুহতার)
খ) নামায পড়ার নিষিদ্ধ সময় ব্যতীত যেকোনো সময়ে তা পড়া যাবে।
গ) কোনো কোনো বর্ণনামতে, তৃতীয় কালিমার সঙ্গে

لا حول ولا قوة إلا بالله العلي العظيم

পড়ার কথা আছে। [লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহিল আলিয়্যীল আযীম] ঘ) রুকু ও সেজদার তাসবীহ যথাযথ পড়তে হবে, তারপর তৃতীয় কালিমাটি পড়তে হবে।
ঙ) কারো কিছু তাসবীহ ছুটে গেলে তা পরবর্তী রোকনে পড়তে হবে (অবশ্য কওমা বা জলসার সময় নয়, অর্থাৎ, রুকু থেকে দাঁড়ানো অবস্থায় বা দুই সেজদার মাঝখানে বসা অবস্থায় নয়)। উদাহরণ, কেউ রুকুতে তাসবীহ কম পড়ে ফেলল, তাহলে সে ঐ রাকআতের প্রথম সেজদাতে তার ক্ষতিপূরণ করে ফেলবে – নিয়ম হলো সেজদার জন্য নির্ধারিত তাসবীহগুলো আগে পড়ে নেবে। তারপর ছুটে যাওয়া তাসবীহগুলো পড়বে। (রাদ্দুল মুহতার)
চ) এই নামাযে, কওমাতে (অর্থাৎ, রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ানো অবস্থায় – যা কিনা সেজদায় যাওয়ার আগের অবস্থা), তাসবীহগুলো হাত বেঁধে (যেভাবে নামাযে হাত বাঁধা হয়) তারপর পড়তে হয়। (আহসানুল ফাতাওয়া)

আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে জীবনে একবার হলেও সালাতুত তাসবীহ আদায় করার তাওফীক দান করুন। আমীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *