সময়ানুবর্তিতা – ৪

ঈমান ও নেক আমলের গুরুত্ব মুসলমান যতটুকুও আজ বোঝে, সূরা আসরে উল্লেখিত (অর্থ:) ‘পরস্পরকে সত্য ও সবরের উপদেশ দেয়’ – এই বিষয়গুলো আজ মুসলমানদের সাধারণ মহলে তো বটেই, দ্বীনি মহলেও যেন অনেক উপেক্ষিত! অথচ মুক্তির সনদ বা সুসংবাদ যে চার শর্তে দেয়া হয়েছে তার মধ্যে এ দু’টিও অন্তর্ভুক্ত!
আমরা অনেকে ঈমান ও আমলের কারণে ‘ আমি তো মুসলমানই!’ – এ কথাটির উপর একদম এতমেনান (অর্থাৎ, পূর্ণ সন্তুষ্ট) হয়ে অন্যান্য দায়-দায়িত্ব বেমালুম ভুলে গিয়েছি। সূরা আসরে উল্লেখিত শেষ শর্ত দুটি সেই অমূলক স্বস্তিকে থামিয়ে দেয় ও মানবজীবনের ব্যক্তি জীবনের সাথে অন্যান্য দায়-দায়িত্বকে জরুরী সাব্যস্ত করে। দ্বীন তো এসেছে দুনিয়া ও আখেরাত – উভয়ের পূর্ণ সফলতার জন্য। এই চারটির প্রত্যেকটি শর্তে এ দিকেই ইঙ্গিত রয়েছে। আল্লাহ তা’আলার হুকুমগুলো কাট-ছাট করে কখনো শান্তি ও সফলতা পাওয়া যাবে না।
হায়াতের উদ্দেশ্য, সময়ের ব্যবহার আল্লাহ তা’আলার আহকাম (হুকুম সমূহ) অনুযায়ী হলেই মুসলমান তাকে সঠিক ও সফলতার পথ ও পাথেয় বলে জানবে, বুঝবে ও শতভাগ বিশ্বাস করবে।

পার্থিব এই হায়াতে আমাদের অন্যতম দায়িত্ব হল পরস্পরকে সত্য ও সবরের উপদেশ দেয়া। এ দায়িত্ব এড়ালে পার্থিব ও পরকালীন উভয় ক্ষতিরই শিকার হতে হবে। মূল কথা হল, নিজে নেক হয়ে ক্ষান্ত হওয়া যাবে না, আবার সৎ কাজে অন্যকে সাধ্য অনুযায়ী সাহায্য করতে হবে – এর সর্বনিম্ন দরজা হল সত্য ও সবরের উপদেশ প্রদান। নিজে নেক হলাম, সত্য অবলম্বন করলাম এবং সবরও করলাম কিন্তু সাধ্যানুযায়ী অধীনস্থ ও অন্যান্যদেরকে কোনই উপদেশ দিলাম না – এটা গ্রহণযোগ্য নয়। এ বিষয়টি অনেক ব্যাপক ও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের মাঝে আজ এই বিষয়ে অনেক গাফলতি। আশ্চর্যের বিষয় হল অধিকাংশ মানুষই জাগতিক কাজে বিষয়টির গুরুত্ব খুব বুঝে, অথচ দ্বীনি বিষয়ে কথা বললেই সব ‘ব্যক্তিগত’ ও ‘যে যতটুকু পারবে করবে’ – এমন সব ওজর-আপত্তি খাড়া হয়ে যায়!

এক দিকে পরস্পরকে সত্য ও সবরের উপদেশ দেয়ার দায়িত্ব পালন দ্বারা দ্বীন সংরক্ষিত হয়, অন্যের হক আদায় হয়, পার্থিব নিয়ম-কানুন শৃংখলাবদ্ধ হয়, অন্য দিকে আখেরাতে এটাই মুক্তির অন্যতম শর্ত। দ্বীনের প্রতিটি বিষয়ের মাঝে গভীর হেকমত নিহিত আছে। মানুষ তার মন-মগজ দিয়ে কখনোই তা পূর্ণরূপে পরিমাপ করতে সক্ষম নয়! অনেক বিষয়ই এমন যা না আমাদের ইন্দ্রিয়ে ধরা পড়ে, আর না বৈজ্ঞানিক গবেষণা এ সম্পর্কে কিছু বলতে পারে।
পরস্পরকে সত্য ও সবরের উপদেশ দেয়ার ভিত্তিতে কালের পরিক্রমায় মানুষের লাভ-ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ তো সময় ও হায়াতের অগ্রযাত্রায় এঁর প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপই করছে না! সারাজীবন এই দায়িত্ব অবহেলার খাতায়ই রেখে দিচ্ছে। তারা তওবা করে না শুধরালে আখেরাতে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আমাদের হায়াত ফুরিয়ে আসছে মানেই হল সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। যা করার এর মধ্যেই করতে হবে। এই পুঁজি খাটানোর বহু পথ ও মত আছে। এমন জায়গাতেই একে খাটাতে হবে যেখানে খাটালে সর্বোচ্চ লাভ। সূরা আসরে তো সর্বোত্তম পথ বলেই দেয়া হয়েছে; আর বাস্তবে এছাড়া কোন গন্ত্যন্তরও নেই!
সময় নামক পুঁজির মাঝে বড় বড় কয়েকটি নেয়ামত হল সুস্থতা, অবসর​,​ সচ্ছলতা​ ও যৌবন।​ ​সময় থাকলেও অনেক সময় এগুলোর অবহেলার ফলে আমরা জীবন বিপন্ন করে দিশাহারা হয়ে যাই। খুব লক্ষ্য রাখার বিষয় – কখন কী করছি? কিভাবে করছি? কেনই বা করছি? যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যক্তি পর্যায়ে এই চিন্তা ও সংশোধন না আসবে, পরিবার, সমাজ, জাতির উপর কোন ইতিবাচক পরিবর্তন আশাই করা যায় না। আর এমন অবস্থায় পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় উন্নতির আশা করব কিভাবে?!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *