শীতকালে ইবাদত: সুযোগ ও সদ্ব্যবহার

শীতকাল ইবাদতের বসন্তকাল!

শীতকাল মুমিনদের জন্য ইবাদতের বসন্তকাল। শীত এলে হযরত ইবনে মাসউদ রা. একে স্বাগত জানাতেন। বলতেন,

مرحبًا بالشِّتاء؛ تتنزَّل فيه البَرَكة، ويطول فيه الليلُ للقيام، ويقصُر فيه النهار للصِّيام

“শীতের সময় বিশেষ বরকত নাযিল হয়। শীতের রাতগুলো বড়। কেন জানো? যেন রাতে আমরা তাহাজ্জুদ পড়তে পারি। আর দিনগুলো ছোট। কারণ কি জানো? কারণ হল যেন আমরা দিনের বেলা রোযা রাখতে পারি।” নবীজী ﷺ শীতকালের রোযাকে ‘শীতল গনীমত’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। কেননা এ সময়ে অল্প শ্রমে অধিক সওয়াব লাভ করা যায়। ইবাদতের এ সময়টিকে অধিক পরিমাণে কাজে লাগানোর জন্য আমরা কয়েকটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ রাখতে পারি।

১- অজু: শীতকালে অযূ করার সময় কনুই, গোড়ালি খেয়াল করে ধুই, অজু ধরে রাখার জন্য চাপাচাপি না করি। হুযূর ﷺ ইরশাদ করেন, ‘আফসোস ঐ গোড়ালীগুলোর জন্য, যেগুলোর ঠিকানা হবে জাহান্নাম (ভালভাবে না ধুয়ার কারণে)।’ -সহীহ মুসলিম: ৪৫৯

ভীতি প্রদর্শনের পাশাপাশি প্রিয় নবীজী আশা জাগানিয়া কথাও বলেছেন। হযরত আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, আমি কি তোমাদেরকে এমন (কাজের) কথা বলব না, যা দ্বারা আল্লাহ তা’আলা পাপরাশি দূর করে দিবেন এবং মর্যাদা উঁচু করে দিবেন? সাহাবায়ে কেরাম আরয করলেন, হ্যাঁ, অবশ্যই ইয়া রাসূলাল্লাহ! নবীজী বললেন, তা হল, অসুবিধা ও কষ্ট সত্ত্বেও পরিপূর্ণভাবে অযু করা, মসজিদে আসার জন্য বেশী পদচারণা এবং এক নামায-এর পর অন্য নামায এর জন্য অপেক্ষা করা। জেনে রাখ, এটাই হল রিবাত (তথা নিজকে দ্বীনি কাজে আটকে রাখা ও শয়তানের মুকাবিলায় প্রস্তুত রাখা)। – সহীহ মুসলিম ৪৮০

তো শীতের এই মৌসমে কষ্ট করে অযূ করার সময়ে একটু যদি খেয়াল করে কনুই গোড়ালি সব জায়গায় পানি পৌঁছাতে পারি, তাহলে আমি পেয়ে যেতে পারি উপরোক্ত হাদীসের ফজীলত। ইনশাআল্লাহ।

২- চামড়ার মোজার ওপর মাসেহ করতে পারি। শীত মৌসুমে সাধারণত আমরা শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতে পায়ে মোজা পরি। এতে অজুর সময় মোজা খোলা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অনেকেই অজুর সময় পা ধোয়ার পরিবর্তে মোজা না খুলে মোজার ওপর মাসেহ করে থাকেন। এটি শরীয়তসম্মত একটি বিধান। বস্তুত মোজার ওপর মাসেহর বিধান মহান আল্লাহর একটি বড় অনুগ্রহ। আবু বকর, ওমর ও আলী রা. সহ বহু সাহাবায়ে কেরাম বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘মুকিম ব্যক্তি একদিন এক রাত এবং মুসাফির তিন দিন তিন রাত মোজার ওপর মাসেহ করবে।’ সহীহ বুখারি : ১/৫৮
তবে কোন ধরনের মোজার ওপর মাসেহ করা যাবে এবং মাসেহ এর পদ্ধতি কি হবে- এ ব্যাপারে শরীয়তের কিছু দিকনির্দেশনা রয়েছে। চামড়ার মোজার উপর মাসেহ জায়েয। কিন্তু চামড়া ছাড়া সুতা বা পশমের তৈরি যেসব মোজা সচরাচর পাওয়া যায় এর উপর মাসেহ সহীহ নয় সুতা বা পশমের মোজায় নিম্নোক্ত শর্তগুলো পাওয়া গেলে তার উপর মাসেহ জায়েয হবে।
শর্তগুলো হচ্ছে:

ক) মোজা এমন মোটা ও পুরু হওয়া যে, জুতা ছাড়া শুধু মোজা পায়ে দিয়ে তিন মাইল পর্যন্ত হাঁটা যায়। এতে মোজা ফেটে যায় না এবং নষ্টও হয় না।

খ) পায়ের সাথে কোনো জিনিস দ্বারা বাঁধা ছাড়াই তা লেগে থাকে এবং তা পরিধান করে হাঁটা যায়।

গ) মোজা এমন মোটা যে, তা পানি চোষে না এবং তা ভেদ করে পানি পা পর্যন্ত পৌঁছায় না।

ঘ) মোজা পরিধান করার পর মোজার উপর থেকে ভিতরের অংশ দেখা যায় না। সচরাচর ব্যবহৃত সুতা বা পশমের মোজায় যেহেতু এসব শর্ত পাওয়া যায় না তাই এর উপর মাসেহ জায়েয হবে না। জামে তিরমিযী ১/১৫; বাদায়েউস সানায়ে ১/৮৩; আলবাহরুর রায়েক ১/১৮২; আদ্দুররুল মুখতার ১/২৬৯

– মাসেহ বৈধ হওয়ার শর্ত: ১. পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করে এবং পা ধুয়ে মোজা পরিধান করা। ২. মোজা দুটি দুই পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত আবৃত করে রাখা। ৩.  মোজাদ্বয় পবিত্র হওয়া। ৪. মোজাটি চামড়া অথবা ওপরে বর্ণিত ধরণের মোজা হওয়া।

– মাসেহর সময়সীমা: নাপাক হওয়ার (অযু আবশ্যক হওয়ার) পর থেকে নিয়ে মুকিমের জন্য একদিন এক রাত এবং মুসাফিরের জন্য তিন দিন তিন রাত পর্যন্ত শরীয়ত মোজার ওপর মাসেহর অনুমোদন করে। গোসল ফরয হলে মোজার ওপর মাসেহের বিধান প্রযোজ্য নয়। সুতরাং পবিত্র অবস্থায় মোজা পরিধানের পর থেকেই এ সময় সীমা শুরু হবে না। বরং পবিত্র অবস্থায় মোজা পরিধানের পর যখন আমার ওপর অযূ আবশ্যক হবে তখন থেকে নিয়ে সময় সীমা হিসেব করতে হবে।

– মাসেহর পদ্ধতি: মোজা দুটির উপরাংশে হাত রাখবো। উভয় হাতের আঙুল প্রশস্তরূপে খোলা অবস্থায় থাকবে। ডান হাতের আঙুল ডান পায়ের আঙুল এবং বাম হাতের আঙুল বাম পায়ের আঙুল বরাবর রেখে উভয় হাতের আঙুল প্রশস্তরূপে খোলা অবস্থায় পায়ের আঙুল থেকে শুরু করে গোড়ালি পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাবে। ব্যাস, মাসেহ হয়ে গেল। – শরহে বেকায়া : ১/৯৯

৩- নফল রোযা রাখি। শীত মৌসমে রোযা হল শীতল গনীমত। – মুসনাদে আহমদ

৪-  যেহেতু রাত অনেক বড় তাই অন্তত দুই রাকাত হলেও রাতে তাহাজ্জুদের নামায আদায়ের চেষ্টা করি।

৫- নামাযের সময় মুখে এমনভাবে চাদর না বাঁধি যে মুখ একটু ও দেখা যায় না।

৬-  আল্লাহ আমাকে শীত নিবারণের বস্ত্রাদী দান করেছেন তাই শুকরিয়া আদায় করি। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

وَاللّهُ جَعَلَ لَكُم مِّمَّا خَلَقَ ظِلاَلاً وَجَعَلَ لَكُم مِّنَ الْجِبَالِ أَكْنَانًا وَجَعَلَ لَكُمْ سَرَابِيلَ تَقِيكُمُ الْحَرَّ وَسَرَابِيلَ تَقِيكُم بَأْسَكُمْ كَذَلِكَ يُتِمُّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكُمْ لَعَلَّكُمْ تُسْلِمُونَ

“আল্লাহ তোমাদের জন্যে সৃজিত বস্তু দ্বারা ছায়া করে দিয়েছেন এবং পাহাড় সমূহে তোমাদের জন্যে আত্ন গোপনের জায়গা করেছেন এবং তোমাদের জন্যে পোশাক তৈরী করে দিয়েছেন, যা তোমাদেরকে গ্রীষ্ম এবং বিপদের সময় রক্ষা করে। এমনিভাবে তিনি তোমাদের প্রতি স্বীয় অনুগ্রহের পূর্ণতা দান করেন, যাতে তোমরা আত্নসমর্পণ কর।” – সূরা নাহল: ৮১

৭- সাধ্যমত শীতার্তদের পাশে দাঁড়াই। মহান আল্লাহ বলেন,

وَآتِ ذَا الْقُرْبَىٰ حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا

“আত্নীয়-স্বজনকে তার হক দান কর এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। এবং কিছুতেই অপব্যয় করো না।”- সূরা বনী ইসরাইল: ২৬

শীতার্তদেরকে আমরা বিভিন্ন উপায়ে সাহায্য করতে পারি। কম্বল, মোটা কাপড় ও শীতবস্ত্র তো দিবোই। পাশাপাশি সাহায্যের একটা দিক এও হতে পারে যে, শীত মৌসমে গরম পানির ব্যবস্থা করা। পরিবারের জন্য, পরিবারের বাইরে অফিসের কলিগ, যে হোস্টেলে আমি থাকি সেখানকার ছাত্র স্টাফদের জন্য গরম পানির ব্যবস্থা করাটাও অনেক বড় নেকীর কাজ। নবীজি ﷺ বলেন, ‘প্রতিটি ভাল কাজেই রয়েছে সদকার সওয়াব।’ অপর হাদীসে নবীজি ﷺ বলেন, যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দুনিয়ার একটি সামান্য কষ্ট দূর করে দিবে আল্লাহ তা’আলা আখেরাতে ঐ ব্যক্তির বিরাট বড় বিপদ দূর করে দিবেন।’

মুমিন কাফির সকলকেই আমরা সহযোগিতা করতে পারি। হুযূর ﷺ বলেছেন, ‘জনৈকা খারাপ মহিলাকে আল্লাহ তা’আলা এ কারণে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন যে, সে একটি পিপাসার্ত কুকুরকে পানি পান করিয়েছিল।’

৮- অতি শীত দিয়ে জাহান্নামীদেরকে আযাব দেওয়া হবে। ওই আযাব থেকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে পানাহ চাই।
আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে সময় কাজে লাগাবার এবং শীত মৌসম থেকে বেশি বেশি উপকৃত হবার তাওফীক দান করুন। আমীন!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *