যিলহজ্ব মাস: গুরুত্ব, ফযীলত ও করণীয়

শায়খ রশিদুদ্দীন আহমদ রহ. বাংলাদেশের একজন আলিমে দ্বীন ছিলেন। উনার ইন্তেকাল হয়েছে ১৯৭৮ সালে ঢাকায়। তিনি এমন সময়ে দ্বীনের পক্ষে কলম ধরেছিলেন যখন এই অঙ্গনে দ্বীনের খাদিম ছিল নিতান্তই কম। আল্লাহ তাআলার শোকর যে, আজ তাঁর লেখা কিতাবাদী প্রকাশ পাচ্ছে! নিম্নোক্ত লেখাটি শায়খ-এর “ঈদুল আযহার পয়গাম” পুস্তিকাটি থেকে সংকলিত। ইনশাআল্লাহ পূর্ণ পুস্তিকাটিই আমাদের সাইটে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হবে। তাঁর পৌত্র রাশেদুর রহমানের কাছ থেকে আমরা পুস্তিকাটি পেয়েছি যা ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা সংশ্লিষ্ট সবাইকে জাযায়ে খায়ের দান করুন। আমীন।

হিজরী বর্ষের বারতম মাস যিলহজ্ব পবিত্র ও সম্মানিত চার মাসের অন্যতম। ইসলামের বিশাল দুটি নিদর্শন হজ্ব ও কুরবানীর মত তাৎপর্যপূর্ণ ইবাদত এ মাসেই পালিত হয়। পবিত্র ও সম্মানিত এ মাসের পবিত্রতা রক্ষা করা জরুরী। এ দিনগুলোকে অপবিত্র করে এমন কোন কাজ যেন আমাদের থেকে প্রকাশ না পায় সে দিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখা উচিত।

এ মাসের সবচেয়ে দামী ও মর্যাদাপূর্ণ সময় হলো এর প্রথম দশক। কুরআন হাদীসে এই দশকের বহু ফযীলত ও গুরুত্বের কথা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالْفَجْرِوَلَيَالٍ عَشْرٍ “শপথ ভোরবেলার, শপথ দশ রাত্রির।” -সূরা ফজর ৮৯ : ১-২। অধিকাংশ সাহাবী, তাবেয়ী ও মুফাসসিরের মত হলো, দশ রাত দ্বারা যিলহজ্বের প্রথম দশ রাত উদ্দেশ্য। তাফসীরে ইবনে কাসীর : ৪/৫০৫

রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, أفضل أيام الدنيا العشر، يعنى عشر ذى الحجة অর্থাৎ, দুনিয়ার সর্বোত্তম দিনগুলো হলো যিলহেজ্বর দশদিন। -মুসনাদে বাযযার : ১১২৮

হযরত ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
ما من أيام العمل الصالح فيها أحب إلى الله عزوجل من هذه الأيام يعنى أيام العشر، قالوا : يا رسول الله ! ولا الجهاد فى سبيل الله؟ قال : ولا الجهاد فى سبيل الله، إلا رجل خرج بنفسه وماله ثم لم يرجع من ذلك بشيئ
অর্থাৎ, “আল্লাহ তাআলার নিকট কোন দিনের নেক আমলই এ দিনগুলোর (যিলহজ্বের প্রথম দশকের) নেক আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় নয়। ছাহাবাগণ আরয করলেন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও নয়? উত্তরে বললেন, না জিহাদও নয়; তবে হ্যাঁ, এমন মুজাহিদের জিহাদ যে জান-মাল সর্বস্ব বিলীন করে জিহাদ করেছে।” -ছহীহ বুখারী : ৯৬৯

হযরত ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলার নিকট যিলহজ্বের প্রথম দশকের আমলের চেয়ে অধিক মহৎ এবং অধিক প্রিয় অন্য কোন আমল নেই। সুতরাং তোমরা সেই দিনগুলোতে অধিক পরিমাণে তাসবীহ (সুবহানাল্লাহ), তাহমীদ (আলহামদুলিল্লাহ), তাহলীল (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু) ও তাকবীর (আল্লাহু আকবার) পাঠ কর। -মুসনাদে আহমদ : ৫৪৪৬
জামে তিরমিযীর একটি বর্ণনায় আছে, আল্লাহ তাআলার নিকট কোন দিনের ইবাদত-ই যিলহজ্বের প্রথম দশকের ইবাদতের চেয়ে অধিক প্রিয় নয়। এর এক দিনের রোযা এক বছরের রোযার সমতুল্য আর এক রাতের ইবাদত শবে কদরের ইবাদতের সমতুল্য। -জামে তিরমিযী : ৭৫৮

প্রকৃত মুমিন বান্দা এই দশকের রাত-দিনগুলোকে নেক আমলের মাধ্যম জীবন্ত ও প্রাণবন্তু করে তুলে। নেক আমলের এই বিশষে মৌসুমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য নফল নামায আদায়, কুরআন তেলাওয়াত, যিকির-আযকার, দান-ছদকা করা এবং নির্ভরযোগ্য দ্বীনী কিতাবাদি পড়া উচিত।

কারো যিম্মায় যদি কাযা নামায থেকে থাকে সেগুলো আদায়েরও এটি সুন্দর সময়। তাছড়া বিভিন্ন হাদীসে এই দশকের বিশেষ কিছু আমলের কথা বিবৃত হয়েছে। যেমন :

১. যিলহজ্বের চাঁদ দেখার পর থেকে কুরবানীর আগ পর্যন্ত নখ, চুল, মোচ, নাভির নিচের পশম ইত্যাদি না কাটা। এটি মুস্তাহাব আমল। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إذا رأيتم هلال ذى الحجة وأراد أحدكم أن يضحى فليمسك عن شعره وأظفاره
‘তোমরা যদি যিলহজ্বের চাঁদ দেখতে পাও আর তোমাদের কেউ কুরবানী করার ইচ্ছা করে তবে সে যেন নিজের চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকে।’ -ছহীহ মুসলিম : ১৯৭৭
যে ব্যক্তি কুরবানী করতে সক্ষম নয় সেও এ আমল করে কুরবানীদাতাদের সাথে ঈদের আনন্দ ও খুশি উদযাপনে অংশীদার হবে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
أمرت بيوم الأضحى جعله الله عيدا لهذه الأمة، قال له رجل : يا رسول الله! أرأيت إن لم أجد إلا منيحة أنثى أفأضحى بها؟ قال : لا، ولكن خذ من شعرك وأظفارك و تقص شاربك وتحلق عانتك، فذلك تمام أضحيتك –
“আমাকে কুরবানীর দিন (কুরবানী করার) আদেশ করা হয়েছে। এই দিবসকে আল্লাহ এ উম্মতের জন্য ঈদ বানিয়েছেন। এক ব্যক্তি আরয করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার কাছে যদি অন্যের দেয়া দুধ পানের একটি পশু থাকে আমি কি তা-ই কুরবানী করবো? উত্তরে নবীজী বললেন, না; বরং তুমি সেদিন তোমার মাথার চুল কাটবে, নখ কাটবে, মোচ কাটবে এবং নাভির নিচের পশম পরিষ্কার করবে। এটাই আল্লাহর কাছে তোমার পূর্ণ কুরবানী বলে গণ্য হবে।” -মুসনাদে আহমদ : ৬৫৭৫, ছহীহ ইবনে হিব্বান : ৭৭৩

২. ঈদের দিন ছাড়া বাকী নয় দিন রোযা রাখা। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুরুত্বের সাথে এই নয় দিন রোযা রাখতেন।” -সুনানে নাসাঈ : ২৪১৫, ২৪১৬, ছহীহ ইবনে হিব্বান : ৬৪২২
বান্দা যেন রবের মেহমানদারি গ্রহণ করে তাই যিলহজ্বের দশ তারিখ থেকে তের তারিখ পর্যন্ত মোট চার দিন রোযা রাখার বিধান নেই। -ছহীহ মুসলিম

৩. বিশেষভাবে নয় তারিখের রোযা রাখা : যিলহজ্বের প্রথম নয় দিনের মধ্যে নয় তারিখের রোযা সর্বাধিক ফযীলতপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
صيام يوم عرفة أحتسب على الله أن يكفر السنة التى بعده والسنة التى قبله ـ
অর্থাৎ, “আরাফার দিনের (নয় যিলহজ্বের) রোযার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে, তিনি এর দ্বারা বিগত এক বছরের এবং আগামী এক বছরের গুনাহ মিটিয়ে দিবেন।”
(ছহীহ মুসলিম : ১১৬২)

আরাফার দিন আল্লাহর দয়া ও রহমতের সাগরে জোয়ার আসে এবং সেদিন তিনি হাজ্বীদের ক্ষমা করে থাকেন, জাহান্নাম থেকে মুক্তির পরওয়ানা দিয়ে থাকেন। তাদের ওসিলায় অন্য অনেক সৌভাগ্যবানও ক্ষমার নেয়ামত লাভ করে থাকে। আমাদের প্রত্যেকের দিলে এই তামান্না থাকা উচিত যে, সেই সৌভাগ্যবানদের তালিকায় আমার নামটিও যেন এসে যায়।

তাকবীরে তাশরীক
যিলহজ্ব মাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো, ‘আইয়ামে তাশরীকে’ ফরয নামাযের পর তাকবীর বলা। নয় তারিখ ফজরের নামায থেকে তের তারিখের আছর নামায পর্যন্ত এ আমলটি চলবে। তাকবীরে তাশরীক হচ্ছে :
الله اكبر الله اكبر لا اله الا الله والله اكبرو الله اكبر ولله الحمد

নামায জামাতের সাথে হোক বা একাকি, পুরুষ মহিলা সবার জন্য প্রতি ফরয নামাযের পর এ তাকবীরটি একবার বলা ওয়াজিব। পুরুষরা উচ্চস্বরে বলবে আর মহিলারা অনুচ্চস্বরে। নামায কাযা হয়ে গেলে তা আদায়ের পরও তাকবীর বলবে। কাযা নামাযের পর তাকবীর বলতে ভুলে গেলে পরে তা কাযা করার কোন বিধান নাই।

ইখলাছ ও বিশ্বাসের সাথে এ দিনে নিম্নোক্ত কালিমাটি বেশী বেশী পড়া উচিত। নবীজী আরাফার দিন এ কালিমাটি খুব বেশী পড়তেন:
(لَا اِلٰهَ اِلَّا اللهُ وَحْدَهٗ لَا شَرِيْكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ بِيَدِهِ الْخَيْرُ وَهُوَ عَلٰى كُلَّ شَيْئٍ قَدِيْرٍ ـ (مسند احمد : ৬৯২২

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *