উসমান ইবনে আফফান রাযিআল্লাহু আনহু (মৃ. ৩৫ হিজরী : ৬৫৬ খৃস্টাব্দ)

যাঁকে দেখে ফেরেশতা পর্যন্ত লজ্জিত। লাজুকতা যাঁর ভূষণ। দু’বার জান্নাত ক্রয় করেছিলেন। তিনি ছাড়া আর কেউ কোন নবীর দু’জন দুহিতা বিয়ে করেননি। হযরত লূত আলাইহিস সালামের পর তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি সপরিবারে হিজরতের মিশন সাফল্যের সাথে সাধন করেছিলেন। ইতিহাসে কীর্তিমান হওয়া বা কারও কৃতজ্ঞতা লাভ করা যাঁর কোন প্রত্যাশা ছিল না। তিনি যুন্নুরাঈন, দুই জ্যোতির অধিকারী হযরত উসমান ইবনে আফফান। আবূ আব্দুল্লাহ্ কুরাইশী উমাবী মক্কী। তৃতীয় খলীফা রাশেদ। মুসলিম জাহানের তৃতীয় রাসূল প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্ণধার। ওহীর সংবাদের ভিত্তিতে যিনি জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজনের একজন। ছয়জনের অন্যতম যাঁদের প্রতি রাসূল আকরাম ﷺ পরলোকগমনের সময় সন্তুষ্ট ছিলেন।
হস্তীবাহিনী আক্রমণের ষষ্ঠ বছরে জন্মগ্রহণ করেন। সোনার চামচ মুখে দিয়ে যাঁর জন্ম। বিত্তবান হয়ে বেড়ে উঠেছিলেন। পরিচ্ছন্ন মনের অধিকারী ছিলেন। সহজাত শুচিতা ছিল তাঁর প্রকৃতিতে। জাহিলী যুগের নীচুতা ও নোংরামি থেকে যোজন দূরে ছিলেন। স্বচ্ছ হৃদয়ে ছিল উচ্চ চরিত্র। ইসলাম গ্রহণে সেই আলো আরও ছড়িয়েছে। হয়েছেন আরও নিকষিত।
অন্তরের অন্তস্তলে নিঃশব্দে সন্তর্পণে স্থান করে নেয় ঈমান। ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বাসের বিকশিত কিরণ। ডাক সম্প্রদায়ের কথায় তাঁর হৃদয় প্রশান্তি ছোঁয়া পায়। দাওয়াতের ডাকে মনে লাগে সুশীতল সমীরণ। মুসলমান হয়ে যোগ দেন শীর্ষ মুমিনের কাতারে। ঈমান ও বিশ্বাসের ঊষাকালের সাক্ষী হলেন। স্থান করে নিলেন সপ্তপ্রধান ও প্রথম অসাধারণের, যাঁদের হৃদয় রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর জন্য সদা উদ্গ্রীব। প্রাণের আকুলতা সতত যাঁর জন্য ব্যাকুল।
প্রাণবন্ত বিবেক স্বচ্ছতায় ছিল পরিপূর্ণ। ইসলামের ছোঁয়ায় তা প্রাণপ্রাচুর্য হয়। প্রতিশ্রুতিশীল স্বচ্ছ বিবেকের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। ছিল না কোন ইতস্তত বা দ্বিধা-সঙ্কোচ। অঙ্কুরেই ঈমান নিকষিত হয়ে যায়। তিনি তাঁর পিতৃব্য হাকাম বিন আবিল আস কর্তৃক নিপীড়নের শিকার হলেন। নিগড়িত হলেন শিকলে। কিন্তু সমাদৃত দ্বীনের প্রতি অবিচলতা দেখে অব্যাহতি দেওয়া হয়। চাচার দুরাচার অবশেষে পশ্রমে পর্যবসিত হয়ে যায়।
সপরিবারে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। হৃদয়রাজ্যে ঢেউ খেলানো ঈমান। আরাম-আয়েশ আর বিলাসিতা ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। ভোগবিলাসী জীবন ছেড়ে ধরলেন বিপদসঙ্কুল এক কঠিন পথ। হযরত লূত আলাইহিস সালামের পর তিনিই প্রথম ব্যক্তি সপরিবারে হিজরত করলেন।
তাঁকে বলা হয় ‘যিননূরাঈন’। দুই জ্যোতি ও আলোয় আলোকিত। নবী ﷺ-এর দুই মেয়ে রুকাইয়্যা ও উম্মে কুলসূমের সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হয়ে কৃতার্থ হন। তাঁর মাতা ছিলেন নবীজীর ফুফুর নাতনি আরওয়া বিনতে কুরাইয। তিনি মুসলমান হয়ে মদীনায় হিজরত করেছিলেন এবং হযরত উসমান রা.-এর শাসনামলে মারা গিয়েছিলেন।
হযরত উসমান রা. নবী ﷺ-এর সাথে উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি বদর অভিযানে যেতে পারেননি। কিন্তু বদর যুদ্ধের গনীমত লাভ করেছিলেন। কারণ তিনি রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর অনুমতিক্রমে নিজের সহধর্মিণী রুকাইয়্যা’র সেবাশুশ্রষা ও দেখাশোনা করেছিলেন। এজন্যই তাঁকে বদরী সাহাবীদের মধ্যে গণ্য করা হয়। মহানবী ﷺ তাঁকে ‘যাতির রিকা’ ও ‘গাতফান’ নামক দুইটি অভিযানে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে পাঠিয়েছিলেন।
তিনি মাঝারি গড়নের ছিলেন। অতি লম্বা বা অতি বেঁটে ছিলেন না। হাস্যোজ্জ্বল চেহারাময় ও হাসিমুখ ছিলেন। দন্তপাটি ছিল সুন্দর। নরম তবিয়ত ও কোমল আখলাক ছিল। সত্তর বছর বয়সে খিলাফতের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কথাবার্তা ও আলাপচারিতায় ছিলেন খুবই অমায়িক।
আব্দুর রহমান ইবনে হাতেব বলেন, সাহাবা কেরামের মধ্যে উসমানের মতো অন্য কোন সাহাবীকে দেখিনি যিনি কথা বললে পূর্ণ কথা বলতেন এবং কথা বলতেন সুন্দর উপস্থাপন করে। অবশ্য তিনি কম কথা বলতেন। হযরত আবূ হুরাইরা রা. বলেন, হযরত উসমান রা. দু’বার জান্নাত ক্রয় করেছিলেন। একবার ‘রূমা’ কূপ ক্রয় করে আরেকবার তাবূক যুদ্ধের সমর অভিযানের রসদ সরবরাহ করার মাধ্যমে।
হযরত উসমান রা. এর হৃদয়-রাজ্য জুড়ে ছিল প্রথম ধাঁচের এক অতুলনীয় লাজুকতা। আর তাঁর মাঝে এমন লজ্জাশীলতা থাকবেই না কেন? যেখানে তাঁকে দেখে শরমার্ত হন ফেরেশতাকুল। একবার রাসূলে আকরাম ﷺ হযরত আয়েশার ঘরে অনাবৃত উরু নিয়ে শোয়ে আছেন। সেই অবস্থায় হযরত আবূ বকর রা. ঘরে ঢুকতে অনুমতি চাইলে আপন অবস্থায়ই অনুমতি দিলেন। কতক্ষণ সেই অবস্থায় কথাবার্তা বললেন। পরবর্তীতে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন হযরত উমর রা.। তাকেও আগের অবস্থায় থেকে অনুমতি দিলেন। এরপর চলে আলাপ-আলোচনা। কিছুক্ষণ পর অনুমতি চান হযরত উসমান ইবনে আফফান রা.। তখন মহানবী ﷺ সোজা হয়ে বসলেন। কাপড়চোপড় ঠিকঠাক করলেন। পদযুগল পোশাক আচ্ছাদিত করলেন। উসমান রা. প্রবেশ করলেন। কতক্ষণ কথাবার্তা উঠে গেলেন।
হযরত আয়েশা রা. বিস্মিত হলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আবূ বকর প্রবেশ করলে কোন ধরনের নড়াচড়া করলেন না। তেমন মনোযোগ দিলেন না। অতঃপর উমর প্রবেশ করার পরও তেমন একটা কেয়ার করলেন না। কিন্তু যখনই হযরত উসমান ইবনে আফফান ঢুকলো তখনই নড়েচড়ে বসলেন এবং কাপড়চোপড় ঠিক করলেন! জবাবে নবী ﷺ মৃদুমন্দ হাসির রেখাময় ঠোঁটে বলে উঠলেন, আয়েশা! আমি কি এমন ব্যক্তির আগমনে শরমিন্দা হবো না যাঁকে দেখে স্বয়ং ফেরেশতা শরম বোধ করেন? (সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২৪০১)। আরেক বর্ণনায় আছে, নিঃসন্দেহে উসমান একজন লজ্জাশীল মানুষ। এই অবস্থায় আমি যদি তাঁকে অনুমতি দিই সে তাঁর প্রয়োজন আমার কাছে (লজ্জার কারণে) বলতে পারবে না। (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস : ৫১৪)
লজ্জাশীলতা বেশি হওয়ার কারণে তিনি বাড়িতে থাকলে দরজা বন্ধ করে রাখতেন। তাঁর পরিশোধিত চরিত্র হৃদয় কাড়তো। সবকিছু ছাপিয়ে ছিল তাঁর হাতের উদারতা। দান করতেন প্রচুর। দানে তাঁর আন্তরিকতা ছিল। তিনি ছিলেন সদাশয়।
মদীনা শরীফে মুসলমানগণ স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করলেন। গড়ে উঠতে থাকে আগামীর জনপদ। সে সময় তাঁদের প্রাথমিক জীবনপ্রবাহ শান্তি-স্থিতিশীলতা নিয়ে এগিয়ে চলতে লাগল। সূচনাপর্বে বিভিন্ন ঝুঁকি-ঝামেলা এবং বিপদাপদ সম্মুখীন হতে থাকে। জীবনধারায় ভেসে উঠে পানির সমস্যা। মিঠে পানি ও পানীয় সংগ্রহ করাই হয়ে দাঁড়ায় সেসব সমস্যা সমাধানের প্রথম পদক্ষেপ। সে মুহূর্তে এই কঠিন কাজটি সমাধান করেছিলেন হযরত উসমান ইবনে আফফান রা.।
তখন মদীনা শরীফে ‘রূমা’ নামক একটি মিঠে পানির কূপ ছিল। যার মালিক ছিল জনৈক ইয়াহুদী। সে মুসলমানদের নিকট তার পানি বিক্রি করতো। অনেক মুসলমানের মিষ্টি পানি সংগ্রহ করার মতো অর্থকড়ি ছিল না। এতে তাদের কষ্ট হতো। বিষয়টি রাসূলে আকরাম ﷺ-কে ভাবিয়ে তুলল। তিনি সাহাবা কেরামকে ডেকে মধুর ও করুণ কণ্ঠে বিষয়টি উপস্থাপন করলেন। কূপের গুরুত্ব ও প্রয়োজনের তাগিদ এবং তাৎপর্য তুলে ধরলেন। তাঁদেরকে কূপটি ক্রয় করতে আগ্রহান্বিত করলেন। হৃদয়গ্রাহী করে বললেন, এমন কে আছে যে, রূমা কূপটি খরিদ করে নিজেও ব্যবহার করবে এবং অন্যদেরকেও ব্যবহার করতে দিবে? নিজের বালতির সাথে অন্যরাও বালতি ফেলে পানি তুলে পানীয় সংগ্রহ করার সুযোগ অবারিত করে দিবে? এর বিনিময়ে জান্নাতে এর চেয়ে উত্তম কূপ সে পেয়ে যাবে। (তিরমিযী, হাদীস : ৩৭০৩)
মহানবী ﷺ-এর কথাগুলো হযরত উসমান রা.-এর কানে আসামাত্রই তিনি তার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে উদ্যত হলেন। যাঁর হৃদয়ে কল্যাণ ও দানশীলতা আনাগোনা করে, যিনি দানদক্ষিণার প্রতিচ্ছবি তাঁর মনে এসব কথা আগ্রহের সাথে রেখাপাত করে এবং তাঁকে হৃদয়গ্রাহী করে তোলে।
তিনি পুরো উদ্যমে উদ্যোগ গ্রহণ করলেন। ইয়াহুদীর সাথে দরকষাকষি শুরু করলেন। এক পর্যায়ে বার হাজার রৌপ্যমুদ্রা (দিরহাম) দিয়ে সেই কূপের অর্ধেক কিনলেন এবং মুসলমানদেরকে ব্যবহারের সুযোগ দান করলেন। একদিন উসমান রা.-এর পানি সংগ্রহের পালা আরেকদিন ইয়াহুদীর। হযরত উসমান রা. এর পানি সংগ্রহ করার দিনে মুসলমালগণ সেই কূপ থেকে পানি নিতে লাগলেন।
ইয়াহুদী বলল, উসমান ! তুমি তো আমার কূপ শেষ করে দিলে ! এ কথা শোনে হযরত উসমান রা. বাকি অর্ধেক কিনে নিলেন আট হাজার দিরহাম দিয়ে।
দানের দু’হাত সবসময় তাঁকে উদ্বুদ্ধ করতো দুনিয়া হতে বিরাগ হতে। সম্পদ তো তাঁর হাতের মুঠোয়। কেউ চাইলে দিতেন দু’হাত ভরে। নবীজী চড়লেন মিম্বরে। দুঃখ-দুশ্চিন্তা তাঁর অন্তর জুড়ে। জিহাদের কাজে দান করতে লোকজনকে উৎসাহিত করলেন। বললেন, কঠিন অভিযানের প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ কে সরবরাহ করবে? জবাবে হযরত উসমান রা. আন্তরিক হয়ে বললেন, একশত উট আসবাবপত্র ও হাতিয়ারসহ আমি আল্লাহ্’র রাস্তায় দান করবো। একথা শোনে নবীজী ﷺ আবার অনুপ্রাণিত করলেন। এবারও নবীজীর ডাকে সাড়া দিলেন হযরত উসমান রা.। ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি দুই শত উট আল্লাহ্’র রাস্তায় দান করবো। সাথে থাকবে উটের রশি, গদি, অন্যান্য সামগ্রী এবং প্রয়োজনীয় হাতিয়ার। বিপদসঙ্কুল সেই অভিযানের রসদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে নবীজী ﷺ আবার বললেন এবং তৃতীয়বার উদ্বুদ্ধ করলেন। এবারও হযরত উসমান রা. নবীজীর ডাকে সাড়া দিলেন। তিনি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! তিনশত উট আমার দায়িত্বে। সেসব উটের রশি, জিন ও রসদসহ ফি সাবীলিল্লাহ্ দান করলাম। নবী ﷺ মিম্বর থেকে নামলেন। তাঁর চেহারা হাস্যোজ্জ্বল। দীপ্তিমান মুখমণ্ডল নিয়ে তিনি বললেন, এরপর উসমানের জন্য অধিকতর আমলের প্রয়োজন নেই। উসমান আর আমল না করলেও তেমন সমস্যা নেই।
উসমান ইবনে আফফান রা. এই তিনশত উট দান করেই ক্ষান্ত হননি। মসজিদে নববীতে সবার সামনে প্রকাশ্য দানের পাশাপাশি গোপনে দান করেছেন অনেক বেশি। যা কল্পনাকেও হার মানায়। সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল সেই দানের ফিরিস্তি। নয়শত পঞ্চাশটি উট এবং পঞ্চাশটি ঘোড়া দান করেছেন। এভাবে দানের কোটা হাজার পূর্ণ করেছিলেন।
মহানবী ﷺ বিপদসঙ্কুল অভিযান (তাবূক অভিযান) ব্যাপারে প্রস্তুতির শেষ পর্ব প্রায় শেষ করলেন। দুনিয়াব্যাপী ও দিগন্তের সর্বত্রে দ্বীন প্রচারে সৈন্যবাহিনীর যাত্রা শুরু করার প্রাক্কালে উসমান ইবনে আফফান রা. বিনয়ী বেশে আসলেন। হাতে একটি থলে। ভিতরে একহাজার স্বর্ণমুদ্রা (দিরহাম)। এনে রাসূলে আকরাম ﷺ-এর কোলে ছড়িয়ে দিলেন। মহানবী ﷺ সেসব মুদ্রা হাতে নিয়ে নাড়াচড়া করে দেখতে লাগলেন এবং বললেন, আজকের পর উসমান আর কোন আমল না করলেও তাঁর কোন ক্ষতি হবে না। (মুসতাদ্রাকে হাকেম, হাদীস: ৪৫৫৩)
আযানের আওয়াজ ধ্বনিত হলো। লোকজন নামাযের জন্য বেরিয়ে পড়ল। ব্যস্ততা সবার সালাতের। মুসল্লিদের ভিড়। মসজিদে মুসল্লিদের সঙ্কুলান হচ্ছে না । মহানবী ﷺ ও টের পেলেন যে, মসজিদ লোকে লোকারণ্য। হৃদয়েপটে উদয় হলো মসজিদ সম্প্রসারণের চিন্তা। কিন্তু অর্থসমস্যা প্রবল বাধা হয়ে দাঁড়ায় এই পরিকল্পনার সামনে।
মহানবী ﷺ দাঁড়ালেন। আল্লাহ্ তাআলার তারিফ-প্রশংসা করলেন। লোকজনকে আহ্বান জানালেন, কে আছে যে অমুক জমিটা খরিদ করে মসজিদ সম্প্রসারণে সহযোগিতা করবে? আল্লাহ্ তাআলা তাঁকে এর বিনিময়ে জান্নাতে উত্তম প্রতিদান দিবেন। সেই কল্যাণমূলক কাজটি করার জন্য আল্লাহ্ তাআলা হযরত উসমান ইবনে আফফান রা.কে সৌভাগ্য দান করলেন। তিনি সেই আহ্বান সাদরে গ্রহণ করলেন। পঁচিশ হাজার দিরহাম দিয়ে সেই ভূমিটি ক্রয় করলেন।
একবার হযরত আবূ বকর রা. এর শাসনামলে খরা দেখা দেয়। তীব্র অনাবৃষ্টির কারণে লোকজন বলল, মেঘবৃষ্টি হচ্ছে না। ভূমি থেকে উদ্ভিদ গজাচ্ছে না। মানুষের মাঝে তীব্র অভাব-অনটন দেখা দিয়েছে। তখন হযরত আবূ বকর রা. আসমানী নূরে আলোকিত হৃদয়ে বললেন, যাও, ধৈর্যধারণ করো। সন্ধ্যা হওয়ার আগেই আল্লাহ্ তাআলা তোমাদের সমস্যা দূরীভূত করবেন…
এ কথা বলতে না বলতেই হযরত উসমান ইবনে আফফান রা. আসলেন। তিনি সিরিয়া থেকে একশত বাহন বোঝাই গম ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী নিয়ে হাজির। ব্যবসায়ীগণ হযরত উসমান রা. এর দরজায় ভিড় জমাতে লাগলেন। বণিক সম্প্রদায় তাঁর দোরগোড়ায় এসে দরজা কড়াঘাত করতে লাগলে তিনি বললেন, তোমরা কী চাও? তারা বলল, সময়টা বড় দুর্দিন। অভাব-অনটন। খরা আর অনাবৃষ্টি। আকাশ থেকে কোন মেঘবৃষ্টি হচ্ছে না। জমিন থেকে কোন উদ্ভিদ জন্মাচ্ছে না। লোকজনের মাঝে অসাধারণ অভাব। জানতে পারলাম, আপনার কাছে অনেক খাদ্যসামগ্রী আছে। আমাদের কাছে কিছু খাদ্যসামগ্রী বিক্রি করুন। আমরা দরিদ্র মুসলিম পরিবারগুলোর মাঝে খাদ্যসম্ভার বিতরণ করতে পারি।
হযরত উসমান ইবনে আফফান রা. বললেন, আসুন, তাশরীফ রাখুন। আপনাদের পছন্দনীয় যে কোন কিছু কিনতে পারেন। তারা কাফেলা আনীত রকমারি খাদ্যসম্ভার দেখতে লাগল। হযরত উসমান রা. বললেন, হে বণিক সম্প্রদায়! সিরিয়া থেকে কেনা এবং মদীনা নিয়ে আসার যাবতীয় খরচাদি বাদে কত লাভে দিতে চাও? তারা বলল, দশ হাজার মূলমানের খাদ্যসম্ভার বার হাজার টাকায় দিবো। তিনি বললেন, আরেকটু বাড়াও। তারা বলল, দশ হাজার মূল্যমানের খাদ্যসম্ভার চৌদ্দ হাজার দিবো। তিনি আরও বেশি চাইলেন। তারা পনের হাজার দিতে চাইল। তিনি আরও বেশি চাইলেন। বণিক সম্প্রদায় বিস্মিত হয়ে বললেন, আবূ আমর উসমান! মদীনায় আমরা ছাড়া আর কোন ব্যবসায়ী নেই। আর কে বেশি দামে কিনবে? তখন হযরত উসমান রা. পর্বতসম সুদৃঢ় ঈমান আর মুত্তাকীদের ভূষণ ধারণ করে বললেন, আল্লাহ্ তাআলা তো আমাকে প্রতি দিরহামে দশ দিরহাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। তোমরা তা দিতে পারবে? তারা লজ্জা বিজড়িত কণ্ঠে বলল, না, আমরা তা পারবো না। তিনি বললেন, আল্লাহ্ তাআলাকে সাক্ষ্য রেখে বলছি, আমার সব খাদ্যসামগ্রী দরিদ্র মুসলিমদের জন্য দান করে দিলাম।
তাঁর ঈমান আন্তরিক বিশ্বাসে ভরা ছিল। বিশ্বাসের পি- শারীরিক হয়ে উঠে। নিজের থেকে সমুচিত প্রতিদান প্রদান করাই হলো মানসিক প্রশান্তির প্রথম পদক্ষেপ। যা হৃদয়ের জন্য আনন্দদায়ক। তাইতো তিনি একবার এক বালককে প্রচণ্ড- রাগের মাথায় কান মলে দেন। সে ব্যথায় কঁকিয়ে উঠে। পরক্ষণে হযরত উসমান রা. চিন্তা-ভাবনা করতে লাগলেন। কৃতকর্মের জন্য চিন্তিত হয়ে উঠলেন। আল্লাহ্ ভীতি মনের ভেতর আন্দোলিত হতে থাকে। বালককে ডাকলেন। সে দৌড়িয়ে সামনে হাজির। হযরত উসমান রা. তাকে বললেন, আমি তোমার কান মোচড় দিয়েছিলাম। তুমি আমার থেকে তার প্রতিশোধ গ্রহণ করো। কিন্তু বালক সে তার প্রতিশোধ নিতে অস্বীকৃত জানায়। লজ্জায় তার হাত ও মুখ আড়ষ্ট হয়ে আসে। এদিকে হযরত উমর রা. নাছোড়বান্দা। প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য পীড়াপীড়ি করে তিনিই তার হাত নিজের কানে লাগিয়ে দিলেন। সে আলতোভাবে আমীরুল মুমিনীনের কানে মর্দন করলেন। উসমান রা. চিৎকার দিয়ে বললেন, শক্ত হাতে মর্দন করো। এই জগতে প্রতিশোধ কতো আরামদায়ক! কী নিষ্কৃতি আখেরাতের প্রতিশোধ থেকে!
হযরত উসমানের রা.-এর এতো বিত্তবৈভব থাকা সত্ত্বেও তিনি দীনদরিদ্রের ন্যায় জীবনযাপন করতেন। সামান্য শুষ্ক কয়েক লুকমা খেয়ে তিনি দুনিয়া গুজরান করতেন। জগত সংসারে এটাই তাঁর জীবনপ্রবাহ। লোকজনকে রাজকীয় আহার্য দান করতেন। নিজে খেতেন সিরকা ও যয়তুন। রাতে ছিলেন রাহেব দিনে ছিলেন সিয়াম সাধক। রাত জেগে ইবাদতে মশগুল থাকতেন। কিন্তু দিনের বেলায় রোযা রেখে দিনের পর দিন কাটাতেন। রাত জেগে নামায পড়ার প্রতি তিনি খুব আসক্ত ছিলেন। এমনকি একদিন তিনি বিতরের নামাযের এক রাকাতে এক দাঁড়ানোর মধ্যে সম্পূর্ণ কুরআন খতম করেছিলেন। যা ‘বুতাইরা’ নামে বিখ্যাত।
জীবন ছিল একদম সাদাসিধে। সহজ-সরল ও সাদামাঠা জীবন ছিল তাঁর ভূষণ। স্মৃতিতে জাগতিক বিষয়ের স্থান ছিল না। সব সময় হৃদয়ে পোষতেন উদারতা ও সন্তুষ্টি। আব্দুল মালিক ইবনে সাদ্দাদ বলেন, উসমান ইবনে আফফানকে দেখলাম। জুমার দিন মিম্বরে বসে আছেন। গায়ে মাত্র চার দিনার মূল্যমানের মোটা তহবন্দ। অথচ সেদিন তিনি আমীরুল মুমিনীন। হযরত হাসান রা. বলেন, উসমান রা.-কে খলীফাতুল মুসলিমীন থাকা অবস্থায় দুপুরের বিশ্রাম মসজিদে নিতে দেখেছি। জেগে উঠার পর তাঁর পার্শ্বদেশে চাটাইয়ের দাগ লেগে ছিল।
তিনি খচ্চর চড়তেন। পেছনে তার গোলাম। তখন তিনি খলীফাতুল মুসলিমীন। এসব কিছু তিনি করতেন মূলত বিনয় প্রকাশের উদ্দেশ্যে। অন্য রাজা-বাদশাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি যাতে ফুটে না ওঠে তাই ছিল তাঁর আরাধনার বিষয়। তাই তো রাতের কিছুক্ষণ অতিবাহিত হওয়া পরই তিনি রাত জেগে ইবাদতে গুজরানের উদ্দেশ্যে উঠে যেতেন। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে তেলাওয়াত করতেন। বার্ধক্য থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজের উযু নিজেই করতেন। কাজের লোককে তিনি জাগাতেন না। তবে কাজের লোক জেগে থাকলে তিনি উযুর পানি চাইতেন। তাঁকে বলা হল, একজন কাজের লোককে বললেই পারেন। সে আপনার উযুর পানির ব্যবস্থা করে দিবে। তিনি বললেন, না। এখন তাদের বিশ্রামের সময়।
দুনিয়া তাঁর নিকট আখেরাতের বাহন ছিল। জগতে ছিলেন একজন ভিনদেশির ন্যায়। ভ্রমণ অপেক্ষায় থাকা একজন মুসফিরের ন্যায় তিনি দুনিয়ায় চলেছেন। তিনি বলতেন, আল্লাহ্ তাআলা তোমাদেরকে দুনিয়া দিয়েছেন এর দ্বারা আখেরাত অর্জনের জন্য। তিনি তোমাদেরকে জাগতিক ধনৈশ্বর্য আর বিষয়-আশয় এজন্য দেননি যে, তোমরা দুনিয়া প্রতি আসক্ত হয়ে পড়বে।
কান্নাকাটি করে হৃদয়তন্ত্রী ছিড়ে ফেলেছিলেন। মনের গহীনে জাগতিক দুশ্চিন্তা ভেঙে খানখান হয়ে গিয়েছিল। চেহারায় তিক্ততা আর আফসোসের ছাপ ছিল। যখন তিনি কবরের নিকট দাঁড়াতেন খুব কাঁদতেন। দাড়িসিক্ত হতো সেই কান্নায়। তাঁকে জিজ্ঞাস করা হলো, জান্নাত-জাহান্নামের কথা আলোচনা করে কাঁদেন না। কিন্তু কবরের কথা বলে এবং কবরের আলোচনা করে করে কাঁদেন কেন?
দু’চোখে আঁসু। অশ্রুসিক্ত নয়নে তিনি বলে উঠলেন, নবীজী ﷺ-কে বলতে শোনেছি। তিনি বলেছেন, (অনুবাদ) কবর জগত আখেরাতের মনজিল ও ধাপসমূহের মধ্যে প্রথম ঘাঁটি। যে ব্যক্তি কবর ঘাঁটি পার পেয়ে যেতে পারবে তার জন্য পরবর্তী ধাপগুলো সহজ হবে। আর যে ব্যক্তি কবর মনজিলে নিষ্কৃতি পাবে না সে পরবর্তী পর্যায়ে কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হবে। (তিরমিযী, হাদীস : ২৩০৮)
বিদ্রোহী গোষ্ঠী তাঁর উপর চড়াও হয়। তাঁর উপর হামলে পড়ে। তারা তাঁকে নিজের বাড়িতে মজলুম ও নির্যাতিত অবস্থায় হত্যা করে। তখন তিনি রোযাদার ছিলেন এবং কুরআন তেলাওয়াত করছিলেন। শাহাদতের পর তাঁর ক্ষতবিক্ষত দেহ মোবারক খুনিদের তরবারির নিচে চাপা পড়ে ছিল। মর্মান্তিক এই ঘটনাটি ঘটেছিল হিজরী ৩৫ সালে। শাহাদাতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। তিনি মুসলিম জাহান শাসন করেছিলেন বার দিন কম বার বছর।