সাবিত আলবুনানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃ. ১২৭ হিজরী : ৭৪৪ খৃস্টাব্দ)

যিনি নামায পড়েছিলেন নিজের কবরে। কল্যাণ ও বরকতের উৎস ও চাবিকাঠি। ইবাদতগুজরানে যাঁর হিস্যা ছিল সিংহভাগ। যুহদ ও দুনিয়াবিমুখিতায় যিনি ছিলেন একজন অশ্বারোহী। ছিলেন রাহমানুর রাহীমের ধ্বনি। যাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হতো কুরআনের তেলাওয়াত। প্রতিটি খুঁটির নিকট বসে কুরআন খতম করেছিলেন। যাঁর হৃদয়ে থাকতো অনুভূতিতে টইটম্বুর। তিনি সাবিত ইবনে আসলাম আলবুনানী রহ.। বিখ্যাত অনুসরণীয় ও আদর্শ ব্যক্তি। দুনিয়াবিমুখ ও ইবাদতগুজার। সময়ের সেরা ব্যক্তিত্ব। কুফা নগরীর ফকীহ ও বুযূর্গ।

বেশি বেশি রোযা রাখতেন। রাত জেগে নামায পড়তেন। কান্নাকাটি করতেন বেশি পরিমাণে। দীর্ঘ সময় ধরে চলতো তার কান্না। শত মানুষের জন্য যথেষ্ট এমন খোদাভীতি ছিল। কুফা নগরীর মসজিদ খোঁজে খোঁজে আবাদ করতেন কান্না আর সেজদা দিয়ে।

হযরত আনাস বিন মালিক রা. বলেন, কল্যাণের বহু সূত্র ও চাবিকাঠি রয়েছে। সাবিত তাদের একজন। বকর ইবনে আব্দুল্লাহ্ বলেন, যে ব্যক্তি তার সময়ের সেরা আবেদ দেখতে চায় তার উচিত সে যেন সাবিত আলবুনানীকে দেখে।

খোদাভীতি আর লজ্জা দিয়ে সাবিত আলবুনানী জীবনকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। দুশ্চিন্তা নিয়ে কাটিয়েছেন জীবনের মুহূর্তগুলো। সন্তানহারা নারীর ন্যায় কাঁদতেন। এমন জ্বলন তার মাঝে ছিল। একদিন তার চোখে ব্যথা। বেশি বেশি কাঁদতে কাঁদতে এমন হয়েছিল। ডাক্তার সাহেব তাকে বললেন, একটি বিষয়ের গ্যারান্টি দিতে পারলে আপনি ভালো হয়ে যাবেন। সাবিত রহ. বললেন, তা কী? ডাক্তার সাহেব বললেন, কাঁদবেন না। সাবিত আলবুনানী বললেন, তখনও তার দু’চোখ অশ্রুতে ছলছল করছে, যে চোখ কাঁদে না সে চোখের লাভ কী? এ কথা বলে আর চিকিৎসাই করালেন না।

তাঁর হৃদয়রাজ্যে বিস্তার করেছিল রাসূল ﷺ-এর প্রতি অগাধ ভালোবাসা। নবীজীর কথা ও আলোচনাযখনই তাঁর কর্ণকুহরে আসতো তখনই ভক্তি ও শ্রদ্ধাবিধৌত অশ্রুতে তাঁর দু’চোখ ছলছল করে উঠতো। রাসূলের প্রতি অসামান্য এই আবেগ ও ভালোবাসা তাঁর অন্তরের অন্তস্তলে প্রোথিত হওয়ার কারণেই তাঁর মাঝে সৃষ্টি হয়েছিল শক্তিশালী জ্বলন, যা উদ্দীপ্ত করেছিল বিখ্যাত সাহাবী হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. এর সান্নিধ্য লাভ করতে। ইতিহাসে পাওয়া যায় যে, সাবিত আলবুনানীর দু’চোখের দৃষ্টি হযরত আনাস বিন মালিক রা. এর উপর পড়ামাত্রই তিনি তাঁর দিকে বাচ্চাদের ঢংয়ে দৌড়িয়ে গেলেন। হুমড়ি খেয়ে পড়ে তাঁর দু’হাতে চুমু খেতে লাগলেন। কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন, আপনার হাত রাসূল ﷺ-এর হাত স্পর্শ করেছে!!

আনুগত্যের সমুদ্রে নিজেকে নিমজ্জিত রেখে খোঁজেছিলেন নিজের হারানো সম্পদ। রাতের প্রহরগুলো কাটিয়েছেন সাধনা করে। সাবিত আলবুনানী রহ. প্রতি রাতে তিনশত রাকাত নামায পড়তেন। সকাল বেলায় তাঁর পদযুগল ক্লান্ত হয়ে উঠতো। দু’হাতে দাবাতেন দু’পা। তারপরও নিজের আমলসমূহ তুচ্ছ মনে হতো। বলতেন, আবেদ ও ইবাদতগুজার লোকজন আমাকে পেছনে ফেলে আগে চলে গিয়েছেন। নিজের সম্পর্কে তিনি বলেন, মসজিদের এমন কোন খুঁটি ও পিলার নেই যেখানে আমি এক খতম কুরআন তেলাওয়াত করিনি। প্রত্যেক খুঁটির নিকট কেঁদেছি।

সাবিত আলবুনানী রহ. সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে হযরত আনাস বিন মালিক রা. এর দরবারে যেতেন। যতবার মসজিদ অতিক্রম করতেন ততবার নামায পড়তেন। সঙ্গী-সাথীরা হযরত আনাস বিন মালিকের নিকট গেলে তিনি জিজ্ঞাসার করতেন, সাবিত কোথায়? সাবিত কোথায়? সাবিতকে আমার খুব ভাল লাগে।

সাবিত আলবুনানী রহ. চোখের পানিতে নয়ন ভাসিয়ে রোনাজারি করতেন আর আল্লাহ তাআলার নিকট চাইতেন, হে আল্লাহ্! তুমি যদি কাউকে তার কবরে নামায পড়ার সুযোগ দান কর তাহলে আমাকে আমার কবরে নামায পড়ার সুযোগ দান কর।

জনশ্রুতি রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলার নিকট তাঁর এই দোআ কবুল হয়েছে। মৃত্যুর পর (স্বপ্নে) দেখা গেছে তিনি তার কবরে নামায পড়ছেন। খালিদ ইবনে আব্দুল্লাহ্ যখন ইরাকের শাসনভার গ্রহণ করেন সে সময় সাবিত আলবুনানী রহ. দুনিয়া ছেড়ে চলে যান। অমর মহামনীষীদের মাঝে তিনি অমর হয়ে আছেন। ১২৩ হিজরী, মতান্তরে ১২৭ সালে তিনি মারা যান।