সাফওয়ান বিন সুলাইম রহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃ. ১৩২ হিজরী : ৭৪৯ খৃস্টাব্দ)

মহান আল্লাহ্ তায়ালাকে কথা দিয়েছিলেন, চল্লিশ বছর ধরে শয্যায় পার্শ্বদেশ লাগাবেন না। না শোয়ার প্রতিজ্ঞা। যাঁর কথায় রোগী আরোগ্য লাভ করে। পীড়িত ব্যক্তির উপশম। যাঁর দোয়া রিযিকের চাবিকাঠি। ফযীলত ও মর্যাদা লাভের জন্য যিনি নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন। দৃষ্টিনন্দিত ব্যক্তি। হামীদ ইবনে আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রা. এর আযাতকৃত গোলাম। তিনি আবূ আব্দুল্লাহ্ সাফওয়ান বিন সুলাইম ইবনে আওফ।
নিভৃতচারী এক যাহিদ। যোগ্য মুজতাহিদ ও গবেষক। প-িতপ্রবর ও হাফিযে হাদীস। বুযর্গ ফকীহ ও ইসলামী আইনজ্ঞ। নির্ভরযোগ্য হাদীস বর্ণনাকারী। অধিক বর্ণনাখ্যাত এক ব্যক্তিত্ব। পরিশ্রমদগ্ধ, মুত্তাকী ও ইবাদতগুজার। আকাশের দিকে দু’হাত তুললে শূন্যহাত ফিরে না। সাধারণ মানুষে মাঝে দীন-দরিদ্রের বিনয়ের বেশে জীবন যাপন করেছেন। আবার ছিল শাহী দবদবা ও প্রতাপ। আল্লাহ্ তায়ালা ব্যতীত অন্য কাউকে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেননি।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেন, সাফওয়ান সুলাইম এমন এক ব্যক্তি, যাঁর কথায় অসুস্থ ব্যক্তি সুস্থ হয়ে ওঠে, যাঁর নাম নিয়ে বৃষ্টি চাওয়া হয় এবং যাঁর আলোচনায় বৃষ্টি নামে। হযরত আব্দুল আযীয ইবনে আবী হাযিম রহ. বলেন, সাফওয়ান ইবনে সুলাইমের সাথে এক সাথে সওয়ার হয়ে মক্কা শরীফ গিয়েছিলাম। ফিরে আসার আগ পর্যন্ত পথিমধ্যে কোথাও তিনি বিশ্রাম গ্রহণ করেননি।
যুহদ ও দুনিয়াবিমুখিতার প্রতি অনুপ্রেরণা যোগাতে সাফওয়ান রহ. বলেছেন, এক সময় এমন হবে যখন মানুষের উদর ও দ্বীনি বিষয়ের একমাত্র অভিলাষ হবে তার প্রবৃত্তি। সবকিছুর নিয়ন্ত্রক হবে মনের খায়েশ। সুলাইমান ইবনে সালিম বলেন, সাফওয়ান বিন সুলাইম গরম কালে তিনি (নফল নামায) বাড়িতে পড়তেন; কিন্তু শীত বেড়ে গেলে পাছে তন্দ্রা না পেয়ে বসে তাই তিনি নামায পড়তেন ছাদে। দু’হাত তুলে দোয়া রোনাজারি করতেন। বলতেন, হে আল্লাহ্! এটা সাফওয়ানের কসরত! আর তুমি তো ভালই জানো।
আল্লাহ্’র ইবাদতগুজার ওলী সম্পর্কে আনাস বিন ইয়ায বলেন, সফওয়ানের আমলের অবস্থা এমন ছিল, যদি তাকে বলা হয় আগামীকাল কেয়ামত তাহলে তার ইবাদতের পরিমাণ বাড়বে না। তিনি সর্বোচ্চ মেহনত-পরিশ্রম করে ইবাদত করতেন। আগামীকাল কেয়ামত হওয়ার সংবাদে যে কেউ বাড়িয়ে ইবাদত করতে আগ্রহী হবে। কারণ অন্যান্য দিন তো সবটুকু খাটুনি দিয়ে ইবাদত করেনি। পক্ষান্তরে সাফওয়ান। তিনি তো চেষ্টার কোন অংশ সঞ্চিত করে রাখেননি।
বাদশাহ সুলাইমান ইবনে আব্দুল মালিক মদীনা শরীফে আগমন করেন। তখন মদীনার আমীর ছিলেন উমর বিন আব্দুল আযীয। তিনি সাফওয়ানের আচার-ব্যবহার এবং আমল-আখলাক দেখে বিমোহিত হন। সাফওয়ান রহ. এর নিকট পাঁচশত দীনানের একটি ব্যাগ পাঠালেন। সুলাইমান ইবনে আব্দুল মালিকের বার্তাবাহক দীনার নিয়ে হাজির হলে সাফওয়ানের শরীর কাঁপতে লাগে। তিনি এসব দীনার আগুনের সদৃশ ছুড়ে ফেলে দিলেন। ছুঁয়ে দেখলেন না। খচ্চরে চড়ে মদীনা থেকে বের হয়ে গেলেন। অবশেষে সুলাইমান ইবনে আব্দুল মালিক চলে যাওয়ার পর মদীনায় আসেন।
খুব খরচ করতেন এবং দান করতেন। কার্পণ্যের ছায়ামূর্তি থেকে দূরে থেকেছেন। অভাবী লোকদের প্রতি দৃষ্টিপাত হওয়ামাত্রই তিনি তাকে দিয়েছেন। এক হিমেল রাতে তিনি মসজিদ থেকে বের হলেন। দেখলেন, বস্ত্রহীন এক লোক। সাথে সাথে নিজের জামা খুলে দিলেন এবং জামাটি তাকে পরিয়ে দিলেন। সাফওয়ান ইবনে সুলাইম মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় কাঁদতেন। তার বুকে থাকতো চাপা গুঞ্জন। লোকজন তাকে ঘিরে জড়ো হয়ে যেতো। জিজ্ঞেস করতো, সাফওয়ান, কাঁদো কেন? তিনি বলতেন, আশঙ্কা হয় না জানি আর মসজিদে আসতে পারি কিনা।
তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন যে, আমৃত্যু বিছানায় শরীর লাগাবেন না। এভাবে চল্লিশ বছর কাটিয়েছিলেন।কখনও তার পার্শ্বদেশ শয্যায় স্পর্শ করেনি। যখন মৃত্যু হাজির এবং প্রাণ ওষ্ঠাগত তখন জিজ্ঞেস করা হলো, আল্লাহ্ তায়ালা আপনার প্রতি রহম করুন। মৃত্যুশয্যায় শায়িত হবে না? তিনি ফ্যাকাশ বদনে শঙ্কাজনিত কারণে ক্ষীণ কণ্ঠে উত্তর দিলেন, তাহলে তো আল্লাহ্ তায়ালাকে দেয়া কথার আর রক্ষা হলো না। তিনি হাঁটু তুলে বসে রইলেন। এভাবে চলে গেলেন দুনিয়া থেকে । ১৩২ হিজরীতে তিনি মদীনায় ইন্তেকাল করেন।
পরবর্তীতে একদিন এক কবর খননকারী একটি কবর খনন করলো। সে একটি মাথার খুলি দেখতে পায় যাতে সিজদার চিহ্ন। লোকজনকে জিজ্ঞেস করা হলো, এই কবরটি কার? বলা হলো, এই কবরটি হযরত সাফওয়ান বিন সুলাইম রহ. এর।