উমর ইবনে খাত্তাব রাযিআল্লাহু আনহু (মৃ. ২৩ হিজরী : ৬৪৪ খৃস্টাব্দ)

তাঁর র্দোরা ছিল রাজা-বাদশাদের তরবারির চেয়ে অধিক ভয়ানক। মানবতার সেরা দান। ইসলামের দীক্ষা ও শিষ্টাচারে লালিত। নবী ও রাসূলদের পর তিনি সর্বাধিক ন্যায়পরায়ণ। মানুষ ক্ষুধার্ত হলে তিনিই প্রথম ক্ষুধার্ত ব্যক্তি। প্রজাকুল পরিতৃপ্ত হলে তিনিই সর্বশেষ পরিতৃপ্ত ব্যক্তি। ইতিহাস তাঁর দরবারে তথ্য সরবরাহের লক্ষ্যে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছে। বিশাল সময় ধরে বিবরণ তুলে ধরছে তাঁর যুহদ ও ন্যায়-ইনসাফের কথা। পৃথিবীকে নিয়ে এসেছে ওহীর যুগ পর্যন্ত। তিনি আবূ হাফস উমর ইবনুল খাত্তাব রা.। আমীরুল মুমিনীন। ন্যায়-নিষ্ঠাবান খোলাফায়ে রাশেদীনের দ্বিতীয় মুসলিম খলীফা। হস্তীবাহিনীর আক্রমণের তের বছর পর তিনি জন্মলাভ করেন। হিজরতের পাঁচ বছর পূর্বে তাঁর হৃদয় উড়ে গিয়েছিল ঈমান-মরূদ্যানে।
তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা ছিল একটি বিজয়। তাঁর হিজরত ছিল সাহায্য এবং শাসন ছিল বিশাল রহমত। হযরত উমর রা. ঈমানের প্রস্রবণে ফেলে দিয়েছিলেন নিজের কলিজার টুকরা। প্রচন্ড-ভাবাবেগ দিয়ে হৃদয়ে গ্রহণ করেছিলেন পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহ।
তাঁর ইসলাম গ্রহণে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। একটা প্রতিধ্বনি শ্রুত হয়েছিল সর্বত্র। শিরক আর পৌত্তলিকতার ভিত কেঁপে উঠেছিল। ইসলামের বার্তা শক্তি সঞ্চার করেছিল। তিনি ইসলামের ছায়াতলে এসে দোর্দ-প্রতাপ নিয়ে বেঁচে ছিলেন। শক্তিমত্তা প্রদর্শন করে পাড়ি জমিয়েছিলেন সুদূর মদীনা শরীফে। সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন ﷺ-এর সাথে সকল সমর অভিযানে। আবূ বকর রা.-এর পর খিলাফত ও ইসলামী শাসনব্যবস্থা তাঁকে ঘিরে প্রতিষ্ঠিত আসনে সমাসীন হয়েছিল। তিনি জ্বালিয়েছিলেন ন্যায় ও ইনসাফের বাতি। সুদৃঢ় হয়েছিল শাসনের রাস ও সংযমের রশি। তাঁর উপস্থিতিতে অপরাধ মুখোশ খুলতেই পারেনি। অসাধারণ মানবীয় গুণাবলী ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর জীবন একটি দীর্ঘমেয়াদি জীবনপ্রবাহ সূচিত করেছিল।
হযরত উমর রা.-এর যুহদ ও অনাড়ম্বরতা জীবন ও জীবিকার ঝুঁটঝামেলা এড়ানো উদ্দেশ্য ছিল না। তাঁর যুহদ ও দুনিয়া বিমুখতা ছিল ঈমানের তাগিদে। শরীরের শিরা-উপশিরায় প্রবহমান ঈমান ও বিশ্বাস নিঃসারিত তাকওয়া ছিল তার সাদামাঠা জীবনের উৎস। আরাম-আয়েশ আর ভোগবিলাসে গা ভাসিয়ে দেননি। মুখরোচক খাদ্য-সামগ্রী নিয়ে মজে ছিলেন না। পাছে কোন নাশুকরি-নিমকহারামি হয় কিনা। অকৃতজ্ঞতার শঙ্কায় থেকেছেন আরামবিমুখ। মহানবী ﷺ-এর দোয়া ও আশীর্বাদের বরকতে তিনি মুসলমান হয়েছিলেন। ﷺ তাঁর জন্য সেরা দোয়া করেছিলেন। (অনুবাদ) মাবুদ, যে উমর তোমার বেশি প্রিয় তার মাধ্যমে তুমি ইসলামের মর্যাদা বৃদ্ধি করো। (তিরমিযী, হাদীস: ৩৬৮১)
কেমন যেন ﷺ তাঁর জন্য দোয়া করেছেন আর আল্লাহ্ তাআলা হযরত উমরকে মনোনীত করেছেন। মহানবী ﷺ প্রশংসা করে বলেছিলেন, (অনুবাদ) আমার পর কেউ যদি নবী হতো তাহলে উমরই নবী হতো। (তিরমিযী, হাদীস: ৩৬৮৬)। দুনিয়া যাবতীয় বস্তুসামগ্রী তাঁর আনুগত্য স্বীকার করেছিল। সবকিছুতে আনুগত্যের একটা সুর ছিল। বস্তুনিচয় সৌভাগ্যের পরশমণি খুঁজে পেয়েছিল তাঁর আনুগত্যে।
হযরত উমর রা. কে দুধ দেয়া হলো। তিনি তা পান করলেন। তৃপ্তি পেলেন চুমুকে। ভালো লাগলো সে দুধ। পরক্ষণেই সাকিকে জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় পেলে এই দুধ? দুধ পরিবেশনকারী তরুণ বলল, পানির ঘাটে গিয়েছিলাম। সেখানে সাদাকা ও যাকাতের এক পাল ছাগল এসে পানি পান করতে লাগল। রাখাল আমাকে সে পালের দুধ দোহন করে আমাকে দিল। সেখান থেকেই আপনাকে এই সরবরাহ। কথা শোনে হযরত উমর রা. অস্থির হলেন। কেমন যেন অগ্নিদগ্ধ হয়ে ছটফট করতে লাগলেন। গলায় আঙ্গুল ঢুকিয়ে সাথে সাথে বমি করলেন। একবার এক যাকাত উসূলকারী হযরত উমর রা.-এর কাছে সামান্য মিষ্টান্ন হাদিয়া পাঠালেন। মিষ্টান্নবাহককে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, সেখানকার সকল মানুষ কি এই মিষ্টান্ন খেয়ে থাকে? লোকটি মাথা নেড়ে বলল, না। আমীরুল মুমিনীন এটা শুধু বিশিষ্টজনের খাবার। সবাই এই খাবার খেতে পারে না। উমর রা. বাহককে বজ্রকণ্ঠে বললেন, কোথায় তোমার বাহনের উট? এই হাদিয়া যে পাঠিয়েছে তার কাছেই নিয়ে যাও । গিয়ে বলো, যতক্ষণ না গোটা রাজ্যের সকল মানুষ এই খাবার খেয়ে পরিতৃপ্ত হবে ততক্ষণ আপনাকে এই খাবার খেতে উমর নিষেধ করেছেন। সাধারণ মানুষের পরিতৃপ্ত আহারের পরই কেবল আপনার খাওয়ার অনুমতি।
হযরত মিসওয়ার বিন মাখরামা রা. বলেছেন, হযরত উমর রা. থেকে তাকওয়া ও পরহেযগারি শিখতে আমরা তাঁর সাথে লেগে থাকতাম। একবার উমর রা. রোগাক্রান্ত হলেন। তাঁকে মধু খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলো। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের এক ছোট কৌটায় সামান্য মধু রয়েছে। তিনি ঘর থেকে লাঠি ভর দিয়ে হয়ে মিম্বরে উঠলেন। বললেন, তোমার অনুমতি হলে মধুটা খাবো। অন্যথায় তা নেওয়া আমার জন্য হারাম। সবাই খুশিমনে অনুমতি প্রদান করে।
একদিন তিনি তাঁর বিবির কাছে গেলেন। তখন তিনি সাদাকা ও যাকাতের কস্তুরি বন্টন করে অবসর হলেন। হযরত উমর রা. সহধর্মিণীর উড়না থেকে কস্তুরির ঘ্রাণ পেয়ে তা ধুয়ে ফেললেন। তিনি ক্ষুধায় রাতযাপন করেন। শক্তিশূন্য শীরের হাড় জিরজিরে অবস্থা। নরম খাবার খান না। শরীরে অনেক ক্ষতি হয়েছে।
সাইয়্যেদা হযরত আয়েশা ও হাফসা রা. হযরত উমরকে জিজ্ঞেস করেন কেমন আছেন তিনি। তখন যুহদের আতিশয্যায় তাঁর প্রাণ হারানোর উপক্রম। হাফসা রা. বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন, নবী ﷺ দুনিয়া থেকে চলে গিয়েছেন। তিনি দুনিয়া চাননি দুনিয়াও তাঁকে চায়নি। তাঁর অনুসরণে আবূ বকর রা.ও চলে গেলেন। এ পর্যায়ে আল্লাহ্ তাআলা আপনার হাতে রোম ও ইরানের সম্পদরাজি তুলে দিয়েছেন। তাদের সম্পদভার আপনার পদতলে। অনারব দূত-প্রতিনিধি আপনার দরবারে ভিড় করছে। আরব প্রতিনিধি-দল আপনার দ্বারস্থ হচ্ছে। অথচ আপনার গায়ে এ মুহূর্তে তালি দেওয়া জুব্বা, যার গায়ে বারটি তালি!! আপনি এর পরিবর্তে কোমল ও মোলায়েম জামা পরতেন একটু গাম্ভীর্য সৃষ্টি হতো। খাদ্যসম্ভারের হাদিয়া আপনার কাছে আসতেই থাকবে। এ কথা শোনে হযরত উমর রা. অনেক কাঁদলেন। দু’হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে তিনি হযরত হাফসা রা. কে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, আল্লাহ্-এর কসম দিয়ে তোমাকে বলি, তোমার জানা আছে যে, নবী ﷺ ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত কখনও টানা তিনদিন যবের রুটি তৃপ্তিভরে খেয়েছেন? কিংবা অন্তত রাতে ও দুপুরে আয়েশ মিটিয়ে খেয়েছেন? হাফসা রা. বললেন, না। এরপর হযরত উমর রা. উভয়জনকে বললেন, তোমরা দু’জন আমাকে দুনিয়ার প্রতি অনুরাগী হওয়ার মানসে আমার কাছে এসেছো। আমি তো ভালোভাবে জানি যে, নবী ﷺ পশমের কাপড় পরিধান করেছেন। জামার রুক্ষতার দরুন কখনও কখনও তার ত্বকে ছুলে গেছে। এটা কি তোমরা জানো? তাঁরা বললেন, হাঁ, তা তো জানি।
এরপর হযরত উমর রা. হাফসা রা.কে বললেন, তুমি জানো যে, নবীজী ছিলেন নিষ্পাপ। তাঁর কোন গুণাহ নেই। সব মাফ। এরপরও তিনি ক্ষুধার্ত ছিলেন। আমৃত্যু তিনি কেঁদে-কেটে সিজদায় পড়ে রাত কাটিয়েছেন!! পরক্ষণে তিনি চিৎকার দিয়ে বলে উঠলেন, উমর কিছুতেই ভালো ও সুস্বাদু খাবার খাবে না। কোমল পোশাক পরিধান করবে না। লবণ আর জয়তুন ছাড়া দু’বেলার খাবার সংরক্ষণ করবে না। নবীজী ও আবূ বকরের অনুকরণে প্রতি মাসে মাত্র একবার গোস্ত খাবে। তিনি আমৃত্যু এমন করেই কাটিয়েছিলেন। সিরকা আর জয়তুন ছিল তাঁর সবচেয়ে উপাদেয় খাবার। শুধু এমন খাবার খেতে খেতে শারীরিকভাবে তিনি অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলেন।
হযরত উমর রা.-এর সহধর্মিণী ছয় দিরহাম রৌপ্যমুদ্রা দিয়ে ঘি কিনেছিলেন। তা দেখে তিনি বললেন, এটা কী? তিনি বললেন, আমার পয়সা দিয়ে একটু ঘি কিনেছি। এটা আপনার পয়সা দিয়ে কিনিনি। তিনি বললেন, লোকজন পরিতৃপ্ত হয়ে না খেলে আমি তা মুখে দিবো না।
নিজের ছেলে আব্দুল্লাহ্ রা. এর নিকট গিয়ে একটু গোস্ত দেখতে পান। তিনি বললেন, এটা কীসের গোস্ত? হযরত আব্দুল্লাহ্ রা. আমতা আমতা করে বললেন, খেতে মনে চাইছে তাই একটু গোস্ত কিনলাম। উমর রা. কিছুটা শক্ত ভাষায় বললেন, মনে চাইলেই খেতে হবে ? মন চাওয়া কোন কিছু খাওয়া মানেই অপচয় করা।
একবার তিনি পানি চাইলেন। মধু মিশ্রিত পানি সরবরাহ করা হলে তিনি বললেন, এটা তো অনেক মজাদার! সুস্বাদু ও মজাদার খাবার সম্পর্কে আল্লাহ্ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
وَيَوْمَ يُعْرَضُ الَّذِينَ كَفَرُوا عَلَى النَّارِ أَذْهَبْتُمْ طَيِّبَاتِكُمْ فِي حَيَاتِكُمُ الدُّنْيَا وَاسْتَمْتَعْتُمْ بِهَا ‘যেদিন ’ (সূরা আহকাফ, আয়াত: ২০)। আমার আশঙ্কা হয়, না জানি আমাকে পরকালের নেয়ামতরাজি এখানে গ্রহণ করার সুযোগ দেয়া হচ্ছে। এই বলে আর পান করেননি।
তিনি খুব ভীত হয়ে জীবন যাপন করেছিলেন। হৃদয়জুড়ে ভয়-ভীতি খুব ছিল। পুরো অন্তর জুড়ে ছিল আল্লাহ্ তাআলা সম্পর্কে অজানা আতঙ্ক। কান পাতলে তাঁর বুকের মাঝে একটা অস্ফুট ধ্বনি শোনা যেতো। বুকের বাইরে একটা সতর্কবার্তা লক্ষ্য করা যেতো। একটা গুঞ্জন শোনা যেতো। মদীনা শরীফে এসে হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রা. উম্মে মুমিনীন উম্মে সালামা-এর নিকট আসলেন। তিনি অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন। উম্মে সালামা রা. তাঁকে দানে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে বললেন, আমি ﷺ-কে বলতে শোনেছি, আমার সাহাবা কেরামের মধ্যে এমন অনেক সাহাবী রয়েছে যাঁরা এখনও মনে করে আমি কখনও ইন্তেকাল করবো না (অর্থাৎ তাঁদের ছেড়ে আমি পরলোকে পাড়ি জমাবো না)। এ কথা শোনে আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রা. কাঁপতে লাগলেন। শব্দমালা তাঁর হৃদয়তন্ত্রীতে গেঁথে গেল। ভীত হয়ে বের হয়ে গেলেন। বিক্ষিপ্তমনে ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলেন। এসে পৌঁছালেন হযরত উমর রা.-এর কাছে। তিনি বললেন, উম্মে সালামা-এর কাছে এ কথা শোনলাম। এ কথা শোনে হযরত উমর রা.ও কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়লেন। মনে হলো যেন পুরো পৃথিবী ঘুরছে। দ্রুত আসলেন উম্মে মুমিনীন উম্মে সালামা-এর নিকট। কাঁপতে কাঁপতে হাঁটু গেড়ে বসলেন। হ্রস্ব স্বরে বললেন, কসম দিয়ে বলি, আমি কি তাঁদের মধ্যে? উম্মে সালামা বললেন, না। আপনার পরে আর কাউকে এই পর্যায় মনে করি না। (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস: ২৬৫৩২)
একদিন হযরত উমর রা. বসে আছেন। তিনি বললেন, যদি আকাশ থেকে কোন আহ্বানকারী আহ্বান করে, হে মানবজাতি! শুধু একজন মানুষ ব্যতীত পৃথিবী সকল মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমার আশঙ্কা, হতে পারে আমি সেই একজন। সকল মানুষ জান্নাতী আর আমি হবো জাহান্নামী।
নিজের গাধায় চড়ে একরাতে হযরত উমর রা. বের হলেন মদীনার অলিগলিতে প্রজাকুলের খোঁজখবর নিতে। জনৈক আনসারীর বাড়ি দিয়ে অতিক্রম করলেন। তাঁকে দেখলেন নামায পড়তে। তিনি নামাযে পড়ছেন কুরআনের এই আয়াতসমূহ:
وَالطُّورِ () وَكِتَابٍ مَسْطُورٍ () فِي رَقٍّ مَنْشُورٍ () وَالْبَيْتِ الْمَعْمُورِ () وَالسَّقْفِ الْمَرْفُوعِ () وَالْبَحْرِ الْمَسْجُورِ () إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ لَوَاقِعٌ () مَا لَهُ مِنْ دَافِعٍ ()
‘শপথ তুর পর্বতের, শপথ কিতাবের, যা লিখিত আছে উন্মুক্ত পাতায়। শপথ বায়তুল মামুরের, শপথ সমুন্নত আকাশের, এবং শপথ উদ্বেলিত সমুদ্রের-আপনার প্রতিপালকের শাস্তি তো অবশ্যম্ভাবী। এর নিবারণকারী কেউ নেই’ (সূরা তূর, আয়াত ১-৭)। উমর রা. বললেন, কা’বা শরীফের রবের কসম, তিনি সত্য বলেছেন। নিজের গাধা থেকে নেমে গেলেন। সেই সাহাবীর বাড়ির দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। বাড়িতে আসার পর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। লোকজন তাঁকে দেখতে আসতে থাকে। খোঁজখবর নিতে থাকে কী তাঁর রোগ। তারা কোন রোগ নির্ণয় করতে পারল না।
একবার হযরত উমর রা. মাটি থেকে একটা খড়কুটা হাতে নিলেন। অজানা এক শঙ্কায় তিনি গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, হায় আমি যদি খড়কুটার ন্যায় হতাম! হায় আমি সৃজিত না হতাম! হায় আমি যদি অস্তিত্ব লাভ না করতাম! যদি আমার আম্মা আমাকে জন্ম দান না করতো! আমি যদি হতাম স্মৃতিবিস্মৃত!
যখন তিনি আক্রান্ত হলেন হযরত ইবনে আব্বাস রা. তাঁর কাছে গিয়ে বললেন, সুসংবাদ গ্রহণ করুন হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহ্ তাআলা আপনার মাধ্যমে অনেক শহরের গোড়াপত্তন করেছেন। মোনাফিকীর দ্বার রুদ্ধ করেছেন। রিযিক ও জীবনোপকরণের পথ প্রশস্ত করেছেন। এ কথা শোনে হযরত উমর ফারুক রা. দীর্ঘ শ্বাস নিলেন, একটা গভীর আকুলতা বোধ করলেন। ক্লান্তি নিয়ে বললেন, ইবনে আব্বাস! তুমি কী আমার রাজত্ব নিয়ে স্তুতি ও গুণকীর্তন করছো? তিনি বললেন, অন্যান্য বিষয় নিয়েও রয়েছে। উমর রা. এর ন্যায়-ইনসাফ পৃথিবীজুড়ে বিস্তৃত। তার সত্ত্বেও তিনি বললেন, ঐ সত্তার কসম যার কুদরতি হাতে আমার জীবন! আমার মনের অভিপ্রায় ও একান্ত বাসনা হলো, আমি দুনিয়ায় যেভাবে (মাসুম-নিষ্পাপ) এসেছি সেভাবে চলে যাই। সমান সমান। সওয়াব নয় গুণাহও নয়। টায়টায় অবস্থায় দুনিয়া থেকে চলে যেতে পারলেই বাঁচি।
এক কাপড় পরিধান করে জগৎ-সংসার পার করেছেন। যাতে ছিল বহু তালি। যুহদ ও দুনিয়া বিমুখতা ছিল তাঁর হৃদয়ের প্রধান আকর্ষণ। মসজিদে মুসল্লিদের উপস্থিতিতে গিজগিজ করছে। নীরবতায় সবারই অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি ও মূক জিজ্ঞাসা, কোথায় আমীরুল মুমিনীন? কেন তিনি দেরি করছেন? কিছুক্ষণ পর উমর ইবনুল খাত্তাব রা. প্রবেশ করলেন মসজিদে। মিম্বরে উঠলেন। লোকজনের কাছে নিজের কৈফিয়ত দিয়ে বললেন, এই কাপড়টি ধুতে দেরি হয়ে গেছে। এই কাপড় ছাড়া আর কোন কাপড় তাঁর নেই। তাই তিনি এটা ধুচ্ছিলেন। সামান্য তালি দেওয়া কাপড় দিয়ে তৈরি করেছিলেন জামা, তহবন্দ ও পাগড়ি। ভঙ্গুর পৃথিবীতে এ জীর্ণ কাপড়চোপড় পরিধান করে বিচরণ করতেন মুকুটহীন এই সম্রাট। আল্লাহ্ তাআলার প্রতি অগাধ শালীনতা আর লজ্জাশীলতার কারণেই তিনি বিলাসিতা পরিত্যাগ করেছিলেন।
উমর ইবনুল খাত্তাব রা. খলীফাতুল মুসলিম হয়ে তালি দেওয়া পশমের মোটা জুব্বা পরিধান করতেন। সেই তালিতে কোথাও ছিল চামড়া। এ অবস্থায় ঘুরে বেড়াতেন বাজার-ঘাটে। কাঁধে থাকতো ন্যায়ের প্রতীক দোররা। দেখাতেন প্রজাকুলকে আলোর পথ। হযরত হাসান রা. বলেছেন, উমর ইবনে খাত্তাব রা. মুসলিম জাহানের রাষ্ট্রপ্রধান হয়েও বারটি তালিযুক্ত তহবন্দ পরিধান করে ভাষণ দিতেন। হযরত আনাস রা. বলেন, যখন উমর ইবনে খাত্তাব রা. আমীরুল মুমিনীন ছিলেন তখন তাঁকে দেখেছি যে, তাঁর জামার কাঁধের উপর উপর তিনটি তালি।
আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ইবনে খাত্তাব রা.-এর নিকট অনেক কাপড় এসেছিল। তিনি সেগুলো লোকজনের মাঝে বিতরণ করে দিলেন। প্রত্যকে একটি করে কাপড় পেল। অতঃপর তিনি যখন মিম্বরে উঠলেন দেখা গেলো তাঁর গায়ে দুইটি কাপড়। তিনি বললেন, হে লোকজন শোন! হযরত সালমান ফারসী রা. বললেন, না আপনার কোন কথা শোনবো না। তিনি বললেন, কেন? সালমান রা. বললেন, আপনি আমাদের মাঝে কাপড়চোপড় বিতরণ করলেন। সবাই একটি করে কাপড় পেল আর আপনি পেলেন দু’টি কাপড়। তখন উমর রা. বললেন, তাড়াহুড়ো করবেন না। ধৈর্যধারণ করুন। তারপর (নিজের ছেলেকে লক্ষ্য করে) তারস্বরে বললেন, হে আব্দুল্লাহ্ বিন উমর, তুমিই বলো আমার গায়ের একটি জামা কি তোমার নয়? বললেন, অবশ্যই একটা জামা আমার। তখন সালমান রা. বললেন, এখন বলুন কী বলবেন। আপনার কথা শোনবো এবং আনুগত্য করবো।
তাঁর অন্তরে বদ্ধমূল ছিল দুনিয়া ও জাগতিক ভয়-ভীতি। যা তাঁর হৃদয় পরিশোধিত ও পরিশীলিত করতো। যার কারণে তাঁর চোখের পানি ঝরতো এবং ঝড়ো হাওয়া আক্রান্ত চড়ই পাখির মতো কাঁপতেন। ফলে জাগতিক কোন চাকচিক্য তাঁকে অনুপ্রাণিত করেনি।
একবার আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাবের নিকট কাদেসিয়া থেকে সেখানকার প্রচুর গনীমত ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আসল। তিনি সেগুলো এভাবে সেভাবে উল্টিয়ে দেখছেন আর কাঁদছেন। তাঁর হৃদয়জুড়ে একটা চাপা উত্তাপ। হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রা. বললেন, আমীরুল মুমিনীন, আজ তো আনন্দের দিন। খুশির দিন। একথা শোনে উমর রা. চোখ মুছে বললেন, হাঁ। তবে এমন সম্পদ যখনই কোন গোষ্ঠির হস্তগত হয়েছে তা তাদের মাঝে বিদ্বেষ ও শত্রুতার বীজ বপন করেছে।
কান্না তাঁর কলবের আহার ছিল। অন্তর শীতল করার জন্য অশ্রু ছিল তাঁর পানি। চোখে কান্না না থাকলে তাঁর হৃদয়ে ব্যথা অনুভূত হয়। তাই তিনি কাঁদতেন সুখে-দুঃখে, আনন্দে-বিপদে। অতি কান্নার ফলে চোখের পানি বেয়ে পড়তে পড়তে তাঁর কপোলে দুটি কালো রেখার দাগ পড়েছিল। গ-দেশের কালো-কৃষ্ণ রেখাদ্বয় মূলত চোখের প্রবহমান অশ্রুবিধৌত রেখা।
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. একবার ফজর নামায পড়াচ্ছিলেন। সূরা ইউসুফ পড়ার সময় তাঁর কান্না পেয়ে বসল। কান্নার এমন তীব্রতা ছিল যে, একদম পেছনের কাতারের লোকজনও তাঁর কান্নার আওয়াজ শোনতে পেল। তিনি এই আয়াতটি বারবার পড়ছিলেন: إِنَّمَا أَشْكُو بَثِّي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ ‘আমি আমার দুঃখ ও মনোকষ্টের আরজি কেবল আল্লাহ্-এর কাছে করছি।’ (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৮৬)। তিনি রাতের অযিফা পালনকালে যখন কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করতেন তখন কেঁদে কেঁদে পড়ে যেতেন। এভাবে অসুস্থ হয়ে বাসায় পড়ে থাকতেন। রাতের বেলায় নামাযের প্রতি তাঁর বেশি আসক্তি ছিল। গভীর রাত জেগে নামায পড়তেন। শেষ রাতে নিজের পরিবার-পরিজনের লোকজনকে জাগিয়ে তুলতেন। বলতেন নামায নামায। বারবার এই আয়াত তেলাওয়াত করতেন:
وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ ‘আপনি আপনার পরিবার-পরিজনকে নামাযের হুকুম করুন।’ (সূরা ত্বহা, আয়াত: ১৩২)। দেদার সম্পদ খরচের জন্য ছিল। তিনি সেগুলো দীনদরিদ্র লোকজনের মাঝে দু’হাতে বিলাতেন। খাইবার থেকে একটা জমি পেয়েছিলেন। ﷺ-এর দরবারে এসে বললেন, একটা জমি পেয়েছি। এমন উৎকৃষ্ট জমি আর কখনও পায়নি। এ ব্যাপারে আপনার সিদ্ধান্ত কী? ﷺ বললেন, ইচ্ছা করলে সেটা নিজের জন্য রাখতে পারো। চাইলে দান করেও দিতে পারে। তিনি সেটা দরিদ্র মুসলমানদের জন্য দান করে দিলেন।
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর ঈমান ও বিশ্বাসের তোড়ে সবধরনের আত্মপ্রতারণা বিতাড়িত হয়েছিল। বাহ্যিক চাকচিক্য আর আড়ম্বর তাঁর কাছেও ঘেঁষতে পারেনি। দুশ্চিন্তা জর্জরিত শরীর নিয়ে তিনি মিম্বরে উঠলেন। ঘাড় উঁচু করে চিৎকার দিয়ে লোকজনকে আহ্বান করলেন। লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে মসজিদ। তিনি বললেন, হে মানুষ! আমার এখনও মনে পড়ে, বনী মাখযুম (গোত্রীয়) মামাদের মেষ-ছাগল চরাতাম। বিনিময়ে মাত্র একমুষ্টি খেজুর। একথা বলে তিনি মিম্বর থেকে নেমে গেলেন। পরক্ষণে শুরু হয় চাপা কান্না। আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রা. কান্না ডিঙিয়ে এগিয়ে গেলেন। জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, আমীরুল মুমিনীন, কী বুঝালেন? হযরত উমর রা. কাঁপা ঠোঁট নাড়লেন এবং অশ্রুসিক্ত চোখে বললেন, একান্তে ভেবে দেখিছি (আমি এ কাজের জন্য যথোপযুক্ত…)। জবাবে আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রা. বললেন, আপনি মুসলিম জাহানের প্রধান শাসক আমীরুল মুমিনীন। আল্লাহ্ তাআলা আর আপনার মাঝে তৃতীয় কেউ নেই। আপনার চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কে?
একবার উমর ইবনুল খাত্তাব রা. মিম্বরে উঠে বললেন, তোমাদের কারও যদি আমার কোন দোষত্রুটি জানা থাকে কসম দিয়ে বলি, আমাকে বল। জনৈক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলে উঠল, হাঁ, আমার মাঝে দু’টি দোষের বিষয় রয়েছে। একথা শোনে হযরত উমর রা.-এর চেহারা হাস্যোজ্জ্বল হয়ে উঠল, মুখমণ্ডল জুরে আনন্দ ছেয়ে গেল। মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, আল্লাহ্ তাআলা তোমাকে রহম করুন, বলো কী সেই দুই দোষ, কী সেই আয়েব? লোকটি বলল, আপনার জামা দু’টি। একটি পরিধান করেন আর অন্যটি খুলে রাখেন। তাছাড়া আপনি দু’ধরনের খাবার গ্রহণ করেন। এ দু’টি মানুষের পক্ষে সম্ভবপর নয়। উমর রা. বললেন, কসম, আমি দুই জামা পরিধান করি না এবং দুই রকমের খাবারও গ্রহণ করি না। এ দীনতায় এ অবস্থায় তিনি আমৃত্যু ছিলেন।
গ্রীষ্মকাল। গরমের তীব্রতা চরমে। সূর্যের কাঠফাটা রোদ এবং লেলিহান শিখা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে বালুরাশিতে। হযরত আহনাফ বিন কায়েস রা.-এর নেতৃত্বে একদল প্রতিনিধি দল এসে আমীরুল মুমিনীনকে খোঁজ করছে। এসে দেখেন মাথার পাগড়ি খুলে নিজের আবা (পরিধেয় আলখেল্লা) কোমরে বেঁধে যাকাতের উটের দাওয়াই লাগাচ্ছেন।
আহনাফ বিন কায়েসকে দেখে উমর রা. চিৎকার দিয়ে বললেন, আহনাফ! কাপড় খোল। এসব উটের যত-আত্তি করার উদ্দেশ্যে উমরকে সাহায্য করো। এগুলো ইয়াতীম, মিসকীন ও বিধবাদের হক। প্রতিনিধি দলের একজন বলে উঠলেন, যে তাঁদের অবস্থান জানে না, হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহ্ তাআলা আপনাকে ক্ষমা করুন, আপনি তো একজন গোলামকে বললেই পারতেন?! উমর রা. বড় বিনয়ের সঙ্গে বললেন, আমি এবং আহনাফের চেয়ে বড় গোলাম আর কে? (আসল কথা হলো) যে ব্যক্তি মুসলমানদের কোন বিষয়ের আমীর, জনগণ সম্পর্কিত দায়িত্বশীল ব্যক্তি যিনি হন তিনিই এসব কিছু সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। একজন গোলামের যেভাবে তার মনীবের হিতাকাঙ্ক্ষী হওয়া এবং দায়িত্ব আদায় করা জরুরি তেমনিভাবে রাষ্ট্রপ্রধানের উপর এসব বিষয় কর্তব্য।
মদীনা শরীফের সড়কে হযরত উমর রা. জলদি হেঁটে চলছেন। পথিমধ্যে হযরত আলী ইবনে আবূ তালেবের সঙ্গে দেখা। বললেন, আমীরুল মুমিনীন! কোথায় যাচ্ছেন? অনায়াসেই জবাব দিলেন, যাকাতের একটা উট ছুটে গিয়ে হারিয়েছে। হযরত আলী রা. হাত মুচড়িয়ে বলতে লাগলেন, পরবর্তী (শাসকবর্গকে) কষ্টে ফেলে গেলেন। এই আদর্শ তাঁদের জন্য অনুকরণীয়, তবে সাধন করা সাধনীয় ব্যাপার। উমর রা. বললেন, ঐ সত্তার কসম যিনি মুহাম্মাদ ﷺ-কে সত্য দ্বীন দিয়ে পাঠিয়েছেন, ফুরাত নদীর তীরে যদি একটি বকরির ছানা খোয়া যায় কেয়ামত দিবসে এজন্য উমরকেই জবাবদিহি করতে হবে।
চাঁদিফাটা রোদে হযরত উমর রা. একবার মদীনার বাইরে গেলেন। তিনি মাথায় চাদর রেখে চলছেন। এমন সময় এক গোলাম গাধায় চড়ে মদীনায় ফিরছে। হযরত উমর রা. বললেন, বৎস! তোমার সাথে আমাকে একটু ওঠাও। বালক থেমে গেল। গাধা থেকে নেমে আদবের সাথে বলল, আমীরুল মুমিনীন! আপনি আরোহণ করুন। তিনি বললেন, না। বরং তুমিই উঠ। আমি তোমার পিছনে সওয়ার হবো। গদির সামনের নরম অংশে আমাকে উঠিয়ে তুমি পেছনের খসখসে অংশে উঠতে চাচ্ছো (?!)।
এভাবে দু’জনের মাঝে বহু পীড়াপীড়ি ও অনুরোধ-উপরোধ শেষে আমীরুল মুমিনীনের কথা বালক সায় দিল। এভাবে গাধায় চড়ে বালকের পেছনে হযরত উমর রা. যখন মদীনায় প্রবেশ করলেন তখন লোকজন দেখে বিস্মিত হলো। (তুমি জিতে গিয়ে বড় হতো চাও ভাইরে এমনি ছলে!)
রাতের বেলায় দু’হাতে ঘুম মুছে শহরবাসীদের অবস্থা অনুসন্ধান করছেন, প্রজাকুলের খোঁজখবর নিচ্ছেন। হঠাৎ নজরে এলো জনৈক মহিলা মশক নিয়ে নগ্নপায়ে রাতের অন্ধকার ভেদ করে এগিয়ে চলছে। জিজ্ঞাসায় বেরিয়ে এলো তথ্য। মহিলা জানালো, পরিবারের দেখাশোনা তাকেই করতে হয়। তার কোন কাজের লোক নেই। তাই পানির সন্ধানে রাতের বেলায় এই অভিযানে সে বেরিয়েছে। পরিবার-পরিজনের কোন ধরনের ক্ষতি হয় কিনা এই আশঙ্কায় সে দিনের বেলায় বের হয় না।
এই অবস্থা শোনে উমরের মনটা ভেঙে গেল। তার থেকে মশক নিয়ে মহিলার বাড়িতে পৌঁছে দিলেন। অতঃপর বললেন, সকালে উমরের কাছে গেলে তোমার জন্য একটা কাজের লোকের ব্যবস্থা করে দিবেন। মহিলা বলল, আমি তাঁর কাছে পৌঁছাতে পারবো না। উমর রা. বললেন, আল্লাহ্ চায় তো তুমি তাকে পাবে। তোমাকে আসতে হবে না। তিনিই তোমার কাছে যাবেন।
ঠিকই পরদিন সকাল বেলায় মহিলার আঙ্গিনায় হযরত উমর রা. হাজির। মহিলা লক্ষ্য করে হযরত উমর রা.কে চিনতে পায়। সে (ভয়ে) পলায়নপর; কিন্তু উমর রা. তার জন্য কাজের লোক ও খরচাদির ব্যবস্থা দিয়ে প্রস্থান করেন।
এক বিশ্বাসঘাতক অগ্নিপূজারী আবূ লুলুয়া-এর আঘাতে হিজরী ২৩ সালে নামায পড়া অবস্থায় হযরত উমর রা. শাহাদাতবরণ করেন। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। শাসনকাল ছিল দশ বছর পাঁচ মাস আটাশ দিন।