সাইয়্যেদুনা হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম

জীবনের প্রারম্ভে যিনি কোন আওয়াজ করেননি। নবজাতকের সূচনাকালের কান্নাকাটি তাঁকে স্পর্শ করেনি। দোলনা থেকে যে নবী কথা বলেছিলেন। তিনিই প্রথম নবী যিনি আকাশে জীবিত আরোহণ করেছেন। পৃথিবীজুড়ে তিনি যুহদের ফেরি করে পর্যটন করেছেন। হৃদয়ের মাঠে বপন করেছেন তাকওয়া ও পরহেযগারি। কল্যাণের বাণী ছড়িয়েছেন। তিনি মারইয়াম তনয় ঈসা। আল্লাহ্’র বান্দা ও তাঁর রাসূল। মারইয়ামের প্রতি তাঁর প্রেরিত বাণীর কল্যাণে যার আগমন। তিনি ছিলেন মাঝারি গড়নের। দোহারা আকারের। খুব দীর্ঘও নয় আবার একেবারে বেঁটেও নয়। মুখমণ্ডল ছিল রক্তিম। সজিবতায় ঠিকরে পড়তো তাঁর গায়ে। যেন এইমাত্র গোসলখানা থেকে বের হয়েছেন।

জন্মকালে তাঁর পার্শ্বদেশে খোঁচা মারতে শয়তানের আনাগোনা হয়েছিল। হয়তো শয়তান আঙ্গুল দিয়ে খোঁচা মারলে অন্য দশটা বনী আদমের ন্যায় তিনি চেঁচিয়ে ওঠতেন নবজাতকের কান্নার সুরে। কিন্তু শয়তান ব্যর্থ। কারণ শয়তানের খোঁচা তাঁর গায়ে না লেগে পর্দায় গিয়ে লাগে। তিনি জীবদ্দশায় হাসিমুখ ছিলেন। চোখে কখনও পানি আসেনি। আল্লাহ্ তাআলা তাঁকে হেকমত-প্রজ্ঞা এবং তাওরাত ও যাবূরের জ্ঞান দান করেছিলেন। অলৌকিক মু’জিযা আর লোকাতীত বিষয়াবলী দিয়ে আল্লাহ্ তাআলা তাঁকে সাহায্য করেছিলেন। তিনি কথা বলেছিলেন দোলনায়। মাটির পাখি বানিয়ে আল্লাহ ইচ্ছায় আকাশে উড়িয়েছেন। তাঁর হাতে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠু রোগীর চিকিৎসা ও আরোগ্যে সাধিত হয়েছিল। তিনি মৃত লোকদের জীবিত করতে পারতেন। এসব কিছু হতো স্রেফ মাবুদের ইচ্ছায়।

মহান আল্লাহ্ তাআলা তাঁকে নিজের কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন। শেষ জামানায় আবার তিনি আকাশ থেকে নেমে আসবেন। দাজ্জালের প্রাণহরণ তিনি করবেন। মুসলমানদের সারিতে দাঁড়িয়ে তিনি নামায আদায় করবেন। ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন। শেষ নবীর প্রতি ঈমান আনয়ন করবেন। অবশেষে তিনি জীবন লীলা সাঙ্গ করবেন। মহান আল্লাহ্ তাআলা’র কাছে আবার চলে যাবেন।

তাঁর হৃদয় পরিবেষ্টিত আছে পবিত্র মেজাজ নিয়ে। সাদা মনের মানুষ। নবুওয়তের শিষ্টাচার ধন্য এক ব্যক্তি। কখনও এমন কথা বলতেন না যা অন্যদের মনোকষ্টের কারণ হতো। হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম বলেন, যে ব্যক্তি তোমার প্রতি সদ্ব্যবহার করে তার প্রতি সদাচরণ করা কোন ইহসান নয়। প্রকৃত ইহসান বলতে বোঝায়, দুর্ব্যবহারের বিনিময়ে সদ্ব্যবহার করা। একগালে চড় খেয়ে আরেক গাল বাড়িয়ে দেওয়া আসল সদাচরণ। একবার তিনি জনৈক ব্যক্তিকে দেখলেন চুরি করছে। নবীর মেজাজ ও স্বভাব নিয়ে বললেন, তুমি কি চুরি করছো ? সে তো জানে যে, সে চুরি করছে। লোকটি বলে উঠলো, যে সত্তা ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তাঁর কসম কখনও নয়। হযরত ঈসা নবীর মেজাজে আবার বললেন, আমি আল্লাহ্ তাআলার প্রতি ঈমান নিয়ে আসলাম। হয়তো আমার চোখ ভুল দেখেছে। (সহীহ বুখারী, হাসীস : ৩৪৪৪)

পূবাহ্নের সময় তিনি অনুচরদের নিয়ে মৃত ছাগল ছানার পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন। যার দুর্গন্ধে লোকজনের কষ্ট হচ্ছিল। অনুচরগণ বললো, কী দুর্গন্ধ! কী কুৎসিত! তাদেরকে কথার শিষ্টাচার শেখাতে তিনি বললেন, কী শুভ্র তার দন্তরাজি! হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম দুনিয়ার সামান্য সামগ্রীও নিজের কাছে রাখেননি। জীবদ্দশায় কখনও ঘরের দেয়াল উঠাননি। পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হয়নি কখনও। আল্লাহ্ তাআলার আনুগত্যে থাকতেন সদাসর্বদা। ফি সাবীলিল্লাহ সময় দিতেন এবং পর্যটন ও সফর করে বেড়াতেন। তিনি বলতেন, দুনিয়া ও জাগতিক বিষয়কে আমি অধোমুখে নিক্ষিপ্ত করেছি। তার সকল আবেদন মুড়িয়ে ফেলেছি। প্রাণ হারানোর মতো কোন সন্তান আমার নেই। বিরান-পরিত্যাক্ত বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার মতো কোন বাড়ি আমার নেই। তাঁর ভক্ত ও আনসারীগণ বলতো, আমরা আপনার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করে দেই? তিনি বলতেন, প্লাবনের মুখে আমার জন্য ঘর বানাও। লোকেরা বলতো, স্রোতের মুখে ঘর বানালে তো টিকবে না। তারা আবারও বলতো, আপনার একজন জীবন-সঙ্গিনীর ব্যবস্থা করে দেই? তিনি বলতেন, মরণশীল বিবি সাহেব দিয়ে কী করব? তাঁকে একদিন বলা হলো, নিজের বাড়ি তৈরি করেন না কেন? বললেন, জগতের এমন কিছু রাখবো না যা আমার পরে স্মৃতি হয়ে থাকে, যা দিয়ে আমি আলোচিত হই। আলোচ্যবিষয় হওয়ার মতো কিছুই থাকবে না আমার।

কখনও বিরান বাড়ি এবং পরিত্যাক্ত ঘরদুয়ার পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় দাঁড়াতেন এবং উচ্চ আওয়াজে বলতেন, দুর্ভোগ তাদের যারা এই বাড়ি-ঘর রেখে জীবন লীলা সাঙ্গ করে চলে গেছে। কতো দুর্ভাগা তারা যারা এ সকল বসতবাড়ি মালিক হয়েছে কিন্তু তাদের পূর্বসূরি ভাই-বন্ধুদের কর্মকা- থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেনি। তিনি পৃথিবী জুড়ে ঘুরে বেড়াতেন। আল্লাহ্ তাআলাকে ডাকতেন। জগত ও জাগতিক বিষয়াবলী তাঁর কাছে ছিল চরম পরিত্যক্ত। আরাম-আয়েশ আর বিলাসিতা ছিল অবহেলিত বিষয়। তিনি হালাল রিযিকের সন্ধানে থাকতেন।

একবার দলবল নিয়ে অনুসারীরা হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের নিকট এসে খাবার চায়। তারা বলল, আমরা কী খাবো? তিনি বললেন, যবের রুটি। তারা বলল, আমাদের পানীয় কী? তিনি বললেন, সাদা পানি। তারা বলল, আমাদের বালিশ কীসের হবে? তিনি বললেন, মাটি ও জমিনই তোমাদের বালিশ। অতঃপর বললেন, মানুষের খিদে পেলে রুটির টুকরোই তার সর্বাধিক প্রিয় খাবার। তৃষ্ণা লাগলে পানিই তার পরম প্রিয় ও পছন্দনীয়। দীর্ঘ রাত জেগে ইবাদত ও বন্দেগীতে মশগুল থাকলে জমিন ও মাটিই তার প্রিয় জিনিস।

একদিন তিনি তাদের মাঝে চিৎকার করে বলে উঠলেন, যবের রুটি খাও। সাথে সামান্য লবণ। কেবল খিদে পেলে খাবে। পশমের চাদর পরিধান করো। দুনিয়া থেকে নিরাপদে চলে যাও আখেরাতে। আমি যথার্থ বলছি, দুনিয়া ও জগতের মিষ্টতা হলো পরকালের তিক্ততা। জগতের তিক্ততা আখেরাতের মিষ্টতা। একদা জনৈক ব্যক্তি হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের নিকট উপদেশ চেয়ে আসল। বলল, আমাকে নসিহত করুন। তিনি বললেন, তুমি তোমার রুটির ব্যাপারে ভাবো তা কোথা থেকে এলো ? রুটিরুজি হালাল কিনা দেখ। দুনিয়া চরিতার্থ করার জন্য কাজ করছো। গলদ ঘর্ম পরিশ্রম করছো জাগতিক উন্নয়ন আর খাদ্য ও জীবিকার জন্য অথচ এই দুনিয়ায় বিনা পরিশ্রমেও খাদ্য-খাবার সরবরাহ করা হয়। পক্ষান্তরে আখেরাতের জন্য আমল করছো না। সেখানে আমল ছাড়া রিযিকের কোন ব্যবস্থা নেই। সেখানে বদআমলী আলেম-উলামা’র বিচার হবে।

একবার তিনি নিজের সঙ্গী-সাথীদের নিকট এসে বললেন, দুনিয়ার মহব্বত সকল গুণাহের মূল। সম্পদ একটি বড় রোগ। লোকেরা বলল, কী সেই রোগ ? তিনি বললেন, ধন ধনাঢ্য ব্যক্তিকে অহঙ্কার ও বড়াই থেকে নিরাপদ থাকতে দেয় না। লোকজন প্রশ্ন করল, যদি নিরাপদ থাকে? তিনি বললেন, সম্পদশালী ব্যক্তি নিরহঙ্কার হলেও সম্পদ তাকে আল্লাহ্ তাআলার যিকির থেকে গাফেল ও উদাসীন করে রাখবে। তিনি সবসময় মানুষকে গুণাহ ও অন্যায় থেকে সতর্ক করতেন। আল্লাহ্ তাআলার রহমত থেকে যে কারণে বঞ্চিত ও বিতাড়িত হয় তা থেকে লোকজনকে সচেতন করতেন। মানুষকে কান্নাকাটি ও অনুশোচনা-অনুতাপ করতে বলতেন। হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম বলেছেন, সুসংবাদ ও খোশখবর সেই ব্যক্তির জন্য যে নিজের গুণাহ ও পাপের কথা স্মরণ করে কাঁদে। খৃস্ট ত্রিশ সালের দিকে তাকে সশরীরে আকাশে তুলে নেওয়া হয়। আল্লাহ্ তাআলার ইচ্ছায় তিনি আবারও পৃথিবীতে আগমন করবেন। হত্যা করবেন দাজ্জালকে। প্রাণ সংহার করবেন শূয়োরের। ভেঙে ফেলবেন ক্রুস। দাওয়াত দিবেন ইসলামের। জয়গান গাবেন, ডাক দিবেন মহাশান্তি ইসলামের।