যিয়াদ ইবনে আবী যিয়াদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃ. ১৩৫ হিজরী : ৭৫২ খৃস্টাব্দ)

যার কথায় রাজা-বাদশাহগণ কাঁদেন। আনুগত্য আর ইবাদত-বন্দেগী করে নিজেকে মার্জিত ও পরিশীলিত করেছিলেন। বিশ্রামের জন্য কখনও গা এলিয়ে দেননি। তার কথা হৃদয় ছুঁয়ে যায়। অশ্রুপাত হয়। তিনি যিয়াদ ইবনে আবী যিয়াদ মাদানী। আব্দুল্লাহ্ ইবনে আইয়্যাশ রহ. এর মুক্তপ্রাপ্ত দাস। বুযর্গ আল্লাহ্ওয়ালা ফকীহ। আমলওয়ালা ইসলামী আইনজ্ঞ। যুহদ ও তাকওয়ার জগতে প্রবাদতুল্য ব্যক্তি। থাকতেন দামেস্কে। সেখানে তিনি যুগশ্রেষ্ঠ আলেমে পরিণত হন। নিজেকে পরিশীলিত ও নিকষিত করতে এমন কোন মর্যাদা ও গুণ নেই যা মেহনত করে হাসিল করেননি। সাধ্য-সাধনা করে ফযীলত লাভ করেছিলেন। দুনিয়া ও জাগতিক মোহ তার চারপাশে ঘুরঘুর করেছে কিন্তু তিনি সেগুলো পাত্তাই দেননি।
উমর ইবনে আব্দুল আযীয রহ. এক নিকট তিনি যেতেন। উপদেশ দিতেন। অথচ তিনি তখন আমীরুল মুনিনীন এবং রাষ্ট্রপ্রধান। হযরত উমর ইবনে আযীয রহ. তাকে সম্মান-সমীহ করতেন। তিনি প্রস্তাব দিয়েছিলেন, সরকারি অর্থায়নে আপনাকে গোলামী জীবন থেকে মুক্তি দেয়া হোক। যিয়াদ ইবন আবী যিয়াদ রহ. সেই অফার গ্রহণ করেননি। অবশেষে লোকজনের অর্থায়নে তিনি দাসত্ব জীবন থেকে মুক্ত হন।
পরিধান করতেন মোটা কাপড়। গোস্ত খেতেন না। লোক সমাগম থেকে দূরে থাকতেন। সচরাচর কারও সাথে বসে কোন ধরনের কোন গল্প করতেন না। দৈনিক মাত্র আধা মুষ্টি আহার গ্রহণ করতেন। দুনিয়ার কোন মূল্য ছিলনা। হৃদয়ছোঁয়া বয়ান রয়েছে। ওয়াযগুলো মানুষের মনে রেখাপাত করতো। আত্মায় কম্পন সৃষ্টি করতো। মহান আল্লাহ্ তায়ালার রাগ-অসন্তুষ্টি ও নাফরমানি থেকে যোজন মাইল দূরত্ব বজায় রেখে জীবন যাপন করতেন।
তিনি বলতেন, কেয়ামত দিবসে বেড়িতে নিগড়িত হওয়ার চেয়ে কষ্ট করে গোনাহ ছেড়ে দেওয়া অতি উত্তম। তিনি নিজেকে খুব সুন্দর করে পরিপাটি করতে পেরেছিলেন। জীবন ছিল পরিশীলিত। সফলতার নিক্তিতে নিকষিত। আত্মপ্রতারণা বলতে কোন কিছুই ছিল না। খায়েশ ও প্রবৃত্তির থাবা থেকে আনুগত্য ছিনিয়ে আনতেন। এই তো বড় আদবের সঙ্গে মসজিদে প্রবেশ করছেন। কিসমত অনুপাতে নামায পড়ছেন। যখনই বের হওয়ার কথা মনের কোণে উদিত হয় তখনই তিনি কেঁপে ওঠেন। নিজেকে তিরস্কৃত করতে থাকেন। বলতে থাকেন, হে মন! আরও বসে থাকো! মসজিদ ছেড়ে কোথায় যাবে? মসজিদের চেয়ে সুন্দর কোন কিছু আছে যেখানে তুমি যাবে? এখানে বসে চেয়ে দেখো। বাইরে গেলে কী দেখবে? হয়তো কারও বাড়ি, হয়তো কারও ঘর? এই তো আর কী? তুমি কি অন্য কোন খাবার খেতে চাও? অন্য কোন পোশাক পরিধান করতে চাও? না, আমার কাছে এই রুটি আর লবণ ছাড়া অন্য কোন খাবার নেই। পশমের এই কাপড় ছাড়া অন্য কোন পরিধেয় বস্ত্র নেই। আর স্ত্রী বলতে এই বুড়ি আছে। তাই আমার কথায় সায় দিয়ে এখানে বসে থাকো। আর আমার কথায় একমত না হলে কিংবা উন্নত কিছু চাইলে মৃত্যুবরণ করতে হবে; সেখানেই সম্ভব উন্নত জীবন!!
এক হিমেল রাতে হাত-পা অবশ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। এমন কনকনে তীব্র শীতের রাতে যিয়াদ ইবনে আবী যিয়াদ রহ. গেলেন আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনে আব্দুল আযীয রহ. এর নিকট। তখন আমীরুল মুমিনীন চিঠিপত্র নিয়ে বসে আছেন। পাশে একটি অঙ্গারধানী জ্বলছে। যিয়াদ পাশে গিয়ে আগুন পোহাতে লাগে। উমর ইবনে আব্দুল আযীয রহ. যখন প্রয়োজনীয় লেখা শেষ করেন তখন তিনিও যিয়াদের পাশে আগুন পোহাতে লাগেন।
উমর ইবনে আব্দুল আযীয রহ. বললেন, যিয়াদ! আমাকে একটু উপদেশমূলক গল্প শোনান এবং ওয়ায করেন। যিয়াদ বললেন, আমীরুল মুমিনীন, আমি তো গল্পকার নই। ওয়ায়েযও নই। উমর ইবনে আব্দুল আযীয রহ. তীব্র আবেগ অনুভব করলেন। ওয়ায শোনার তীব্র আগ্রহ প্রকাশ করলেন। বললেন, বলুন। যিয়াদ রহ. বললেন, দুনিয়ায় বাগ-বাগিচায় প্রবেশ করে কোন মানুষের লাভ নেই যদি আগামী দিন (মরণের পর) জাহান্নামে তার ঠিকানা হয়। এই দুনিয়ায় কষ্ট করলে কোন ক্ষতি নেই যদি আগামী দিন জান্নাতে থাকার ব্যবস্থা হয়ে যায়। এ কথা শোনে উমর ইবনে আব্দুল আযীয রহ. বললেন, ঠিক বলেছেন।
এ কথা বলে তিনি কাঁদতে লাগলেন। চোখের পানিতে নয়ন ভাসলো। এমনকি কিছু অঙ্গারও নিভে গেল। এই মহান মনীষী হিজরী ১৩৫ সালে দুনিয়া জীবন শেষ পরকালের অন্তহীন