মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদির রহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃ. ১৩০ হিজরী : ৭৪৮ খৃস্টাব্দ)

কান্নাকাটি করে যাঁরা দুনিয়ার জগতে আল্লাহ্ তায়ালার প্রিয়বান্দা হওয়ার সৌভাগ্য লাভে করেছিলেন তিনি তাদের প্রধান কর্ণধার। চল্লিশ বছর ধরে নিজেকে নিকষিত করে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। আখেরাতের চিন্তায় যিনি ছিলেন বিভোর। রাতের শেষ প্রহরে ঝিরঝিরে বাতাসের ছোঁয়ায় যিনি নিজের হৃদয়কে করেছিলেন প্রশান্ত। দু’চোখের পানিতে নিজে অবগাহন করেছিলেন বহুবার। তিনি মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদির ইবনে আব্দুল্লাহ্ ইবনুল হুদাইর ইবনে আব্দুল উয্যা। যিনি একাধারে কুরাইশী তামীমী মাদানী। শাইখুল ইসলাম। ইবাদতগুজারে শাহসওয়ার। সাইয়্যিদুল র্কুরা তথা প্রধান ক্বারী। মহান যাহিদ, ইবাদতগুজার ও কান্নাপ্রবণ ব্যক্তি। সততা সৃষ্ট খান্দানি মানুষ। অন্যতম হাদীস বিশারদ। কয়েকজন সাহাবা কেরামকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেন।
প্রাণপ্রাচুর্যে টইটম্বুর ছিলেন। ঈমানে বলীয়ান। মুত্তাকীদের কা-ারী। তাওয়াক্কুল ও খোদাভরসার প্রতীক। তায়াক্কুল চেতনার ধারক। রাত জেগে নামায পড়তেন প্রচুর। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আলোচনা হলে তিনি কাঁদতেন। চোখের জলে নয়ন ভাসাতেন। তিনি নিজের অবস্থার বর্ণনা দিচ্ছেন, চল্লিশ বছর ধরে নিজেকে ঝালিয়ে এবং নিকষিত করে সহীহ তরীকায় প্রতিষ্ঠিত করেছি।
তিনি ছিলেন অনুভূতিপরায়ণ ব্যক্তি। পরিচ্ছন্ন হৃদয়ের অধিকারী। দু’চোখে থাকতো অশ্রু। রাতের অন্ধকারে ইবনুল মুনকাদির রহ. জেগে ইবাদত-বন্দেগী করতেন। যার গুঞ্জনে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে যেতো। রাতের বেলায় মুসল্লায় দাঁড়িয়ে নামায পড়তেন বিরামহীনভাবে। কান্না তাঁর মধ্যে প্রবল ছিল। সর্বদা কাঁপতেন এবং ছটফট করতেন। মনে হতো ভাজনকড়ায় একটি চড়াইপাখি। এতে পরিবারের লোকজন আশঙ্কা হয়। তারা তাঁকে জিজ্ঞেস করলো, আপনি কাঁদেন কেন? তিনি নির্বাক হয়ে গেলেন। ভেতরে চাপা আবেগ থাকলেও মুখে কোন কথা বললেন না। শুধু কাঁদলেন আর কাঁদলেন। তারা তাঁর বন্ধু আবূ হাযিমকে ডেকে পাঠালেন। তিনি দ্রুত গিয়ে ইবনুল মুনকাদিরের নামায পড়ার স্থানে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ভাইজান কাঁদেন কেন? আপনার কান্না পরিবারের লোকজনকে ভাবিয়ে তুলেছে। আপনার কোন অসুবিধা আছে বা কোন অসুখ হয়েছে? ইবনুল মুনকাদির রহ. বললেন, তখন তাঁর গ-দেশ বেয়ে চোখের পানি ঝরছিল, কুরআনের একটি আয়াত আমাকে এই অবস্থায় উপনীত করেছে। আবূ হাযিম রহ. বললেন, সেই আয়াতটি কী? আল্লাহ্ তায়ালা আপনার উপর রহম করুন। অনুগ্রহ করে আয়াতটি বলুল।
ইবনুল মুনকাদির রহ. বললেন, আয়াতটি এই (অনুবাদ) ‘তাদের জন্য আল্লাহ্ তায়ালার নিকট হতে এমন কিছু প্রকাশিত হবে যা তারা কল্পনাও করেনি।’ (সূরা যুমার, আয়াত : ৪৭)। আবূ হাযিম কাঁদলেন। ইবনুল মুনকাদিরও অঝরে কাঁদলেন। উভয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে অশ্রুবিধৌত সাগরে অবগাহন করলেন। পরিবারের লোকজন বলল, হে আবূ হাযম, আমরা আপনাকে নিয়ে এসেছি ইবনুল মুনকাদিরের কান্না থামানোর উদ্দেশ্যে। উল্টো আপনি তার কান্না আরও বাড়িয়ে দিলেন।
মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদির রহ. এর একজন অসুস্থ প্রতিবেশী ছিল। রাতের বেলায় সে চিৎকার করতো। তখন মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদির তারস্বরে প্রশংসা করতেন এবং যিকির করতেন। বিষয়টা জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, আমার প্রতিবেশী কষ্টে পড়ে চিৎকার করে আর আমি নেয়মতে পড়ে চিৎকার করছি।
জনৈক ব্যক্তি ইবনুল মুনকাদির রহ. এর নিকট একশ দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) আমানত রাখে। তিনি তাকে বললেন, ভাইজান! প্রয়োজন হলে আমি খরচ করতে পারবো? পরে আমি পরিশোধ করে দিবো। লোকটি বলল, ঠিক আছে। দরকার হলে খরচ করবেন। পরবর্তীতে ইবনুল মুনকাদির রহ. প্রয়োজনে সেগুলো খরচ করেছিলেন। ইতোমধ্যে লোকটি আমানত চেয়ে একজনকে ইবনুল মুনকাদির রহ. এর নিকট পাঠাল। সে মুহূর্তে ইবনুল মুনকাদিরের বাড়িতে কোন কিছুই ছিল না। ঋণ আদায় করার মতো তার ব্যবস্থা না থাকায় তিনি আকাশের দিকে দু’হাত তুলে রোনাজারি করতে লাগলেন, খুব কাঁদতে লাগলেন। হে পরওয়ারদেগার! আমার আমানত আদায় করার ব্যবস্থা করো। সেগুলো নষ্ট করো না।
দোয়া শেষ করে কোন প্রয়োজনে বাইরে গেলেন। হঠাৎ অচেনা অজানা এক লোক হাজির। কাঁধে একটি ব্যাগ। তাতে ছিল একশত দীনার। লোকটিকে দীনারের ব্যাগ দিয়ে আমানত আদায় করে দিলেন। ইবনুল মুনকাদির রহ. আমৃত্যু জানলেন না কে এই অর্থকড়ি পাঠিয়েছে।
জনৈক ব্যক্তি বলেছেন যে, এই ব্যাগটি আমাকে দিয়ে আমির ইবনে আব্দুল্লাহ্ ইবনুয যুবাইর রহ. পাঠিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এগুলো ইবনুল মুনকাদিরকে দিয়ে এসো। আমি বা ইবনুল মুনকাদিরের মৃত্যুর আগে এই বিষয়টা কাউকে জানাবে না। উভয়জন মারা যাওয়ার আগে এই ঘটনা আমি কারও নিকট প্রকাশ করিনি।
ইবনুল মুনকাদির রহ. মৃত্যুশয্যায় শায়িত। অবিরাম কাঁদছেন। হাত-পায়ে কম্পন। তাঁর অবস্থা দেখে লোকজন বিস্মিত। তারা আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, কী নিয়ে পেরেশান? হা-হুতাশ কেন? প্রাণ ওষ্ঠাগত ব্যক্তির কণ্ঠধ্বনিতে বললেন, কুরআনের একটি আয়াত নিয়ে শঙ্কিত। যতসব দুশ্চিন্তা এই আয়াতটি নিয়ে। আয়াতটি এই (অনুবাদ) ‘তাদের জন্য আল্লাহ্ তায়ালার নিকট হতে এমন কিছু প্রকাশিত হবে যা তারা কল্পনাও করেনি।’ (সূরা যুমার, আয়াত : ৪৭)। আমারও আশঙ্কা, না জানি আল্লাহ্ তায়ালার পক্ষ হতে এমন কোন কিছু প্রকাশিত হয়ে যায় যা আমি ভাবতেও পারিনি।
লোকজন তাঁকে অভয় দিতে লাগলেন। এক পর্যায়ে তাঁর মুখম-ল চেরাগের ন্যায় ঝলমল করতে লাগলো। তিনি দুনিয়াকে গুডবাই (বিদায়) জানানোর ভঙ্গিমায় বললেন, আমি যে অবস্থায় আছি তোমরা তা দেখতে পেলে তোমাদের নয়ন জুড়ে যেতো। এভাবে দুনিয়ার প্রয়োজন ফুরিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। হিজরী ১৩০ সালে তাঁর জীবনাবসান হয়।