মালিক বিন দীনার রহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃ. ১৩১ হিজরী : ৭৪৯ খৃস্টাব্দ)

নিজের যুহদ, দুনিয়াবিমুখতা ও বুযর্গি দিয়ে জাগতিক মোহ দূরীভূত করেছিলেন। আল্লাহ্ তায়ালার আনুগত্যে ও বন্দেগীতে যাঁর মন ভেঙে হয়েছিল অতি বিনীত। যিনি হৃদয়ের দুয়ারগুলো কল্যাণের জন্য উন্মুক্ত করেছিলেন। আল্লাহ্ তায়ালার নৈকট্য লাভের জন্য যিনি নিজের শিরা-উপশিরায় ক্ষুধার আগুন প্রজ্বলিত করেছিলেন। এমন ঘরে জন্মগ্রহণ করেন যাদের হৃদয়পটে ঈমানের আসন ছিল সুদৃঢ়। যাদের অন্তরে ইয়াকীন ছিল টইটম্বুর। তিনি আবূ ইয়াহ্ইয়া মালিক ইবনে দীনার। বসরা নগরীর অধিবাসী। হাদীস বর্ণনাকারীদের একজন। বিখ্যাত ক্বারী। শীর্ষস্থানীয় মুত্তাকী। নেককার ওয়ায়েয ও উপদেশদাতা।
নিজের হাতে উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। হস্তলিপিতে কুরআন তৈরী করে বিক্রি করতেন। তবে নিজের পানাহারের চেয়ে বেশি পারিশ্রমিক গ্রহণ করতেন। হস্তলিপির কুরআনের মূল্য দিয়ে তিনি শুধু আহার্য সংগ্রহ করতেন। সেই অর্থ সবজিবিক্রেতাকে দিয়ে তার থেকে খাবার নিতেন। আল্লাহ্ তায়ালার যিকির দিয়ে নিজের অন্তর আবাদ করেছিলেন। প্রাণবন্ত হৃদয় থেকে উৎসারিত কথাগুলো মানুষের মাঝে জাদুর ন্যায় প্রভাব ফেলতো।
হযরত মালিক ইবনে দীনার বলতেন, আমি সব গুনাহের প্রতি লক্ষ্য করেছি। কিন্তু অর্থের মোহের মতো কোন গুনাহ দেখিনি। তিনি আরও বলেন, মানুষকে যখন থেকে চিনতে পেরেছি তখন থেকে তাদের তারিফ-প্রশংসা শোনে খুশি হইনি। আবার তাদের নিন্দা ও দুর্নাম রটাতে দেখে বিমর্ষও হইনি। প্রশ্ন করা হলো, কেন? তিনি বললেন, মানুষের মাঝে যারা স্তাবক তারা বাড়িয়ে বলে। আর যারা নিন্দুক তারা কমিয়ে বলে।
একদিন তিনি মানুষের মাঝে আগমন করলেন। তিনি তাদেরকে উপদেশসুলভ এ কথা বললেন, দুনিয়া পরিহার করে চলো। এই দুনিয়া উলামাদের অন্তরকেও মোহিত করে। হযরত মালিক বিন দীনার রহ. এর কালে মুনাফিকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ আসলে তিনি বললেন, মুনাফিকদের লেজুড় গজালে চলার মতো কোন ভূমি তারা পাবে না।
তিনি নিজের জন্য ভূরিভোজন এবং উদরে জাগতিক বিষয়াবলী পুঞ্জীভূত হওয়ার ব্যাপারে আশঙ্কা করতেন। তিনি বলতেন, তোমরা নিজেদের উদরকে শয়তানের থলে বানিও না। সেখানে শয়তান যাচ্ছেতাই সঞ্চয় করতে থাকবে।
তিনি বলতেন, কত নিকৃষ্ট সেই লোক! যার প্রবৃত্তি ও উদর নিয়েই যাবতীয় চিন্তা-ফিকির। পূবাহ্নের সময় মালিক বিন দীনার রহ. নিজের এক বন্ধুকে নিয়ে বসলেন। তিনি তাকে বললেন, চল্লিশ দিন ধরে একটি বাসনা মনে পোষণ করে আসছি। মনে চায় মাখন দিয়ে রুটি খাই। এ কথা শোনে লোকটি বাতাসের গতিতে তার বাড়িতে গেল। পলকের মধ্যে সে রুটি আর মাখন নিয়ে হাজির। মালিক ইবনে দীনারের নিকট পেশ করলেন। মালিক ইবনে দীনার রহ. রুটিটি হাতে নিলেন। চোখের সামনে রুটিটি উল্টিয়ে দেখছেন। কিছুটা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বললেন, চল্লিশ বছর ধরে আমি তোমার বাসনায় ছিলাম। এতো দিন তুমি পরাজিত ছিল। আজ তুমি আমাকে পরাজিত করতে চাচ্ছো!! হবে না! হবে না! দূর হও! এ কথা বলে তিনি রুটি খেতে অস্বীকৃতি জানালেন।
তিনি কী খান, কী আহার করেন, কীভাবে উদরপূর্তি করেন তার একটা বিবরণ আমাদেরকে দিলেন। তিনি বলেন, বছর পার হয়ে যায়। দিনের পর দিন গুজরান হয় কিন্তু কুরবানীর দিন ছাড়া অন্য কোন দিন আমি গোস্ত খাই না। সুন্নাত হওয়ায় শুধু কুরবানীর গোস্ত খেয়ে থাকি।
তিনি আড়ষ্ট জবান এবং দুঃখে বুকভাঙা হৃদয়ে বলেন, আমি আমার পরিবারের জন্য এক দিরহাম দিয়ে একটি হরিণ খরিদ করেছি। তার জন্য বিশ বছর ধরে নিজের কাছে তার হিসাব খুঁজে পাই না। এখনও তার কূল-কিনারা পেলাম না। একদিন কোন কিছুর জন্য তার অভিলাষ হয়েছিল। অমনি তিনি নিজের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। নিজের দাড়ি ধরে তিরস্কৃত করতে লাগলেন, কোন কিছু মনে চাইলেই খেতে হবে? কোন কিছুতে চড়তে মনে চাইলেই আরোহণ করতে হবে? হে মালিক! এটা অনেক নিকৃষ্ট কাজ!
একদিন জনৈক লোক তাকে বলল, আবূ ইয়াহইয়া! দৈনিক দু’টি রুটি আপনার জন্য যথেষ্ট? তিনি বললেন, তাহলে তো মোটা হতে চাই। (এতে আমি মুটিয়ে বিলাসী হয়ে যাবো)। একদিন মালিক ইবনে দীনার রহ. হাজ্জাজের আযাদকৃত গোলাম হাওশাব সাফাকীকে দেখে ডাক দিলেন। আবূ বিশর! আমার থেকে দু’টি বিষয় গ্রহণ করো। ক্ষুধার্ত অবস্থায় অনাহারে রাত কাটাও এবং মনে চাওয়ার পর (পরিমিত) আহার গ্রহণ করো।
দুনিয়ার বাড়ি-ঘর, আসবাবপত্র এবং আহারের প্রতি তার আসক্তি ছিল না। নিজের ঘরের দরজার কোন তালা ছিল না। কোন দারোয়ান ছিল না। বন্ধু-বান্ধব আর প্রতিবেশীদের নিয়ে বসে থাকতেন। বলতেন, আমার ঘরে গিয়ে কেউ কোন কিছু পেয়ে নিলে তা তার জন্য হালাল। তবে আমি আমার জন্য তালা-চাবির প্রয়োজন মনে করি না। একবার মালিক বিন দীনার মক্কা শরীফের পথ হাঁটছিলেন। উচ্চস্বরে বললেন, আমি দোয়া করবো। তোমরা আমার দোয়ায় ‘আমীন’ বলো। এরপর দু’হাত তুলে রোনাজারি করতে লাগলেন, হে আল্লাহ্! মালিক বিন দীনারের ঘরে দুনিয়া অল্পবিস্তর ঢুকতে দিওনা।
একদিন হযরত মালিক ইবনে দীনার ও তার প্রতিবেশীর বাড়িতে আগুন লাগে। হযরত মালিক বিন দীনার রহ. পবিত্র কুরআন শরীফ ও একখানা কাপড় নিয়ে বের হয়ে গেলেন। জিজ্ঞাসিত হলেন, আবূ ইয়াহইয়া! বাড়ি তো আগুনে জ্বলছে! তিনি প্রশান্ত মনে বললেন, আমার বাড়িতে পুড়ে যাওয়ার মতো কোন কিছু নেই। কাপড়ের কিনারা ধরে বলতে লাগলেন, ভারী লোকদের সর্বনাশ হয়ে গেছে! যারা অনেক বিত্তবৈভবের মালিক তাদের সমূহক্ষতি হয়ে গেল।
রাতে যখন আঁধার ছেয়ে গেছে এবং বাড়িঘর অনাকার অন্ধকার ডুবে গেছে এমন সময় সাল্লাম ইবনে আবী মুতী’ হযরত মালিক বিন দীনার রহ. এর দরবারে গেলেন। গিয়ে দেখেন, তার বাড়িতে চেরাগ নেই। হযরতের হাতে একখানা রুটি। বললেন, হে আবূ ইয়াহইয়া! ঘর আলোকিত করার মতো কোন চেরাগ নেই? রুটি রাখার মতো পাত্র নেই? মালিক ইবনে দীনার বললেন, তার কণ্ঠে উদ্বেগের ছাপ, আল্লাহ্’র কসম! আমি বিগত দিনের জন্য লজ্জিত।
একবার মালিক বিন দীনারের ঘরে চোর প্রবেশ করেছিল। কিন্তু নেওয়ার মতো কোন কিছু খুঁজে পায়নি। ইতোমধ্যে চোরের উপস্থিতি টের পেয়ে মালিক বিন দীনার রহ. উচ্চস্বরে বললেন, দুনিয়ার কোন কিছু যখন খুঁজে পেলে না আখেরাতের কিছু একটা নিবে? চোর বলল, হাঁ। তিনি বললেন, উযূ করে দুই রাকাত নামায পড়ো। এরপর চোরকে নিয়ে গেলেন মসজিদে। তিনি বলছিলেন, এসেছিল চুরি করতে। এখন আমরাই তাকে চুরি করে ফেললাম।
ইবাদত আর যিকিরের আসক্ত ছিলেন। মহান আল্লাহ্ তায়ালার মাগফিরাতের জন্য লালায়িত ছিলেন। তিনি বলেন, আল্লাহ্ তায়ালার যিকিরের নেয়ামতধন্য লোকেরাই অধিক নেয়ামতপ্রাপ্ত। সঙ্গী-সাথী পরিবেষ্টিত হয়ে তিনি আছেন। বলছেন, দুনিয়াদাররা দুনিয়া থেকে চলে গেছে। তারা আজ অধুনালুপ্ত। তারা গত হয়ে গেছে। কিন্তু এখনও তারা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সুস্বাদু খাবার আস্বাদন করেনি। লোকজন বলল, সেটা কি? তিনি বললেন, দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত হলো আল্লাহ্ তায়ালার মারেফত, আল্লাহ্কে চেনা, মাবুদকে জানা।
রাতের একদম শেষ প্রহরে তিনি জেগে নামাযে লেগে যেতেন। হাত দিয়ে দাড়ি আঁকড়ে ধরতেন। রোনাজারি করতেন আর বলতেন, হে আল্লাহ্! আপনি যখন পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী লোকদেরকে এক মাঠে একত্রিত করবেন তখন মালিক বিন দীনারের সাদা দাড়িগুলোর জন্য জাহান্নাম হারাম করে দিবেন। একবার বসরার শাসক জমকালো মিছিল নিয়ে জাঁক করে মালিক বিন দীনারের নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। মালিক বিন দীনার ধমকের সুরে বললেন, এই চাল কমাও। এতে নিরাপত্তা রক্ষীরা ক্ষিপ্ত হয়ে মালিক বিন দীনারকে আটক করতে উদ্যত হয়। কিন্তু গভর্নর বলে উঠে, না, ওকে চটাবে না। এরপর সামান্য দেমাগের স্বরে বললো, আমাকে চিনেন? মালিক বিন দীনার বিশাল দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, অবশ্যই। আমি আপনাকে চিনি। আমার চেয়ে আপনাকে আর কে বেশি চিনে? আপনার অস্তিত্বের প্রথম অংশ্য নোংরা ও নাপাক পানি (বীর্য ও শুক্রাণু)। আবার আপনার পরিণতি হবে দুর্গন্ধ মৃতদেহ। আবার পেটে বহন করে চলেছেন মল-বিষ্ঠা। গভর্নর মাথা ঝুঁকিয়ে চলে যায়। বলতে থাকে, এবার আমাকে যথাযথভাবে চিনতে পেরেছেন।
একদিন বসরার গভর্নর মালিক বিন দীনারকে ডেকে পাঠালেন। তিনি প্রবেশ করলে গভর্নর সাহেব বললেন, আবূ ইয়াহ্ইয়া! আমার জন্য দোয়া করুন। মালিক বিন দীনার রহ. বললেন, আপনার গেইটে কত লোক! যারা আপনার জন্য বদদোয়া করছে!
মালিক বিন দীনার মৃত্যুশয্যায় শায়িত। আকাশের দিকে মাথা উঠিয়ে বলতে থাকে, হে আল্লাহ্! তুমি তো জানো যে, আমি দুনিয়ায় থাকতে চাইনি। ঔদরিক ও জৈবিক কোন চাহিদার জন্য দুনিয়া আমার হৃদয়গ্রাহী নয়। একথা বলে তিনি আখেরাতের সফরে যাত্রা করেন। মৃত্যুবরণ করেন বসরা নগরীতে। হিজরী ১৩১ সালে তিনি মারা যান।