মানসূর ইবনুল মু’তামির রহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃ. ১৩২ হিজরী : ৭৪৯ খৃস্টাব্দ)

মহরাবে যেভাবে পড়ে থাকতেন মনে হতো এখনই মারা যাবেন। পরকালের চিন্তা-ফিকিরে কাটিয়েছিলেন জীবনকাল। রাতের তিন ভাগের একভাগ কেঁদে কেঁদে কাটাতেন। নামায আর সিয়ামসাধনাই ছিল হৃদয়ের অন্তরঙ্গ বন্ধু। মনেপ্রাণে কামনা করতেন আখেরাত এবং দুনিয়া এড়িয়ে চলতেন। দেখলে মনে হতো রাজ্যের দুশ্চিন্তা মাথায় তুলে রেখেছেন। তিনি আবূ আত্তাব মানসূর ইবনুল মু’তামির ইবনে আব্দুল্লাহ সুলামী। হাদীস ও তাকওয়ার জগতের কিংবদন্তী। কুফা নগরীর অধিবাসী। তৎকালে তার চেয়ে বেশি অন্য কারও হাদীস মুখস্থ ছিল না। নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী। অধিক কান্নাকাটি করার দরুন বেশি চোখের পীড়ায় ভুগতেন। চল্লিশ বছর ধরে সিয়ামসাধনা করেছিলেন। দিনের বেলায় রোযা রাখতেন আর রাতের বেলায় জেগে জেগে নামায পড়তেন।
মানসূর ইবনুল মু’তামিরকে কেউ দেখলে মনে হতো, কোন বিপদগ্রস্ত লোক, নির্মীলিত নয়নযুগল, আওয়াজ ক্ষীণ এবং অশ্রুভেজা চোখ। ছোঁয়া লাগলেই অঝরে পড়তে থাকবে চোখের পানি, ভাসতে থাকবে দু’নয়ন। সুফইয়ান সাওরী রহ. তার নামাযের বর্ণনা দিচ্ছেন, মানসূরকে নামায পড়তে কেউ দেখলে তার মনে হবে তিতি বোধহয় এখনই মারা যাবেন।
এক রাতের শেষ প্রহরে মানসূরের আম্মা তার ছেলের কান্নার শোনতে পান। তিনি দ্রুত যান। করুণা করে বললেন, মানসূর এমন করছো কেন? রাতের অধিকাংশ সময় ধরে কাঁদছো তো কাঁদছোই। মনে হয় তুমি মনোরোগে আক্রান্ত। এভাবে কি তুমি নিজের জীবননাশ করে দিবে। মানসূর বলল, মা, আমি কী করছি তা ভালো করেই জানি।
রাতের ইবাদত সম্পর্কে তার মায়ের বর্ণনা, রাতের তিন ভাগের একভাগ কুরআন তিলাওয়াত করে কাটাতো এবং দ্বিতীয় তৃতীয়াংশে দোয়ায় মশগুল থাকতো। রাতে বাড়ির ছাদে নামায পড়তো। মনে হতো রাতের আঁধারে কোন কাঠের টুকরো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।
কুফা নগরীর শাসক ইউসুফ ইবনে উমর মানসূরকে বিচারপতি পদে নিয়োগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে ডেকে পাঠালেন। কিন্তু তিনি সেটা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন। এতে প্রশাসন চটে গিয়ে জোরপূর্বক তাকে বিচারপতির চেয়ারে বসায়। এখন মানসূর বিচারপতি। ইতোমধ্যে দুইজন মামলা নিয়ে হাজির। তারা মানসূরের সামনে বসে আছে। কিন্তু তিনি তাদেরকে জিজ্ঞাসাও করলেন না। কোন কথাও বললেন না। এক পর্যায়ে তারা উঠে চলে যায়।
ইউসুফ বিন উমরকে বিষয়টা অবহিত করা হলো এবং বলা হলো, আপনি যদি তার গোস্ত কিমাও করে ফেলেন তবুও মানসূর বিচারকার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করবে না। পরে তিনি মানসূরকে ছেড়ে দেন। ১৩২ হিজরীতে মানসূর ইবনুল মু’তামির রহ. দুনিয়া ছেড়ে চলে যান।