তালহা ইবনু মুসাররিফ রহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃ. ১১২ হিজরী : ৭৩০ খৃস্টাব্দ)

ফেরেশতা দীক্ষিত ব্যক্তি। পরিমার্জিত একজন মানুষ। যাঁর হৃদয়রাজ্যে শুধু দুশ্চিন্তা। আখেরাতে নিজের অবস্থান দেখা ব্যতীত জীবনে কখনও রঙ্গরসিকতা ও হাসি-তামাশা না করা যাঁর প্রতিজ্ঞা। নিজের জবান দয়া ও কৃতজ্ঞতার নিগড়ে নিগড়িত ছিল। নীরবে ধ্যান করতেন। যাঁর দৃষ্টিতে ছিল শিক্ষা। কথায় থাকতো যিকির। হৃদয়ে দগ্ধ হতো শত বেদনা। তাকওয়া ও পরহেযগারি ছিল যাঁর ভূষণ। তিনি তালহা ইবনে মুসাররিফ ইবনে কা’ব ইবনে আমর। আলহামাদানী আলকূফী। আবূ মুহাম্মাদ। প্রধান ক্বারী। মুত্তাকী লোকদের কর্ণধার।

যুগশ্রেষ্ঠ ক্বারী। কুফা নগরীতে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ কুরআনের আলেম ছিলেন। তাকওয়া ও পরহেযগারীতে তিনি অতুলনীয়। সততা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষায় অনন্য। নীরবতার পথধরে প্রবেশ করেছিলেন আখেরাতে পথে। তাঁর আখলাকে ইমাম আহমাদ রহ. ছিলেন প্রীত ও মুগ্ধ। ইমাম শা’বী রহ. বলেন, তালহা ইবনে মুসাররিফের চেয়ে জবান নিয়ন্ত্রণকারী অন্য কাউকে আমি দেখিনি। আব্দুল মালিক ইবনে আবজার রহ. বলেন, দলবদ্ধ লোকদের মাঝে যখনই আমি তালহা ইবনে মুসাররিফকে দেখেছি মনে হয়েছে সবার চেয়ে তিনি শ্রেষ্ঠ।

হাত তুলে দোয়া করতেন, হে আল্লাহ্! আমার নীরবতাকে তুমি ধ্যানে পরিণত করো। আমার দৃষ্টিকে তুমি শিক্ষণীয় করো এবং আমার কথা যিকিরে পরিণত করো। সুনামের বেড়াজালে নিজেকে জড়াননি। গোটা কুফা নগরীর ক্বারী সাহেবান তাঁকে কুরআন শরীফ শোনাতেন। তাঁদের আধিক্য দেখে তিনি কেমন যেন অপছন্দ করতেন। তিনি চলে গেলেন হযরত আ’মাশ রহ.এর নিকট। তাঁকে তিনি কুরআন তেলাওয়াত করে শুনালেন। এতে লোকজন তালহা রহ.কে বাদ দিয়ে হযরত আ’মাশ রহ. এর প্রতি ঝুঁকে পড়ে।

একদিন তিনি হাসলেন। পরক্ষণে নিজেকে শাসালেন। নিজের প্রবৃত্তিকে তিরস্কৃত করলেন এই বলে, কেন তুমি হাসলে? যে আখেরাতের সকল ঝুঁকিপূর্ণ স্তর শেষ করে পুলসিরাত পার হয়েছে সেই কেবল হাসতে পারে। এরপর বললেন, কসম, আমি আর কখনও হাসবো না। পরকালের বিষয়াবলী না জেনে আর রঙ্গ-রসিকতা আর করবো না। বাস্তবে দেখা গেছে, আমৃত্যু তিনি আর হাসেননি।

জনৈক ব্যক্তি তাঁকে বলল, হে মুসাররিফের ছেলে! খাদ্য বিক্রি করে তুমি লাভবান হতো পারো। তিনি দুনিয়াবিমুখ লোকদের ন্যায় উত্তরে বললেন, মানুষের চেয়ে আমার মনের প্রাচুর্যপূর্ণ অবস্থা আল্লাহ তাআলা জানুক তা আমি চাই না। তাঁর তাকওয়ার একটি নমুনা হল, একবার তিনি তাঁর এক প্রতিবেশী মহিলার দেয়ালে একটি কীলক মারতে গিয়ে তার অনুমতি চাইলেন। সেই মহিলা তাঁকে জানালেন, কীলক কেন ইচ্ছে করলে আপনি আমার দেয়ালে জানালাও কাটতে পারেন।

এক প্রতিবেশী মহিলা তাঁর সম্পর্কে বর্ণনা দিচ্ছে যে, আমাদের কাজের বুয়া তালহা ইবনে মুসাররিফের বাড়িতে আগুন আনতে গিয়েছিল। সে সময় তালহা নামায পড়ছিলেন। তালহার বিবি তাকে বলল, তুমি একটু দাঁড়াও। তোমার শিকে স্বামীর ইফতারির গোস্তটুকু ভুনা করে নিই। তালহা নামায শেষে চিৎকার করে বললেন, তুমি কী করলে? তাকে দাঁড় করিয়ে তারই শিকে আমার জন্য তুমি গোস্ত ভুনা করেছে ? সেই কাজের বুয়াকে এই গোস্ত না দিলে আমি তা খাবো না।

তালহা ইবনে মুসাররিফ রহ. মৃত্যুশয্যায় শায়িত। প্রাণ ওষ্ঠাগত। তীব্র ব্যথায় তিনি গোঙাচ্ছেন। তাঁকে বলা হলো, হযরত তায়ূস রহ. মৃত্যুমুখে কোঁকানো অপছন্দ করতেন। এ কথা শোনার পর আমৃত্যু তিনি আর গোঙাননি।
হিজরী ১১২ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন।