আইয়্যূব সিখতিয়ানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃ. ১৩১ হিজরী : ৭৪৯ খৃস্টাব্দ)

যাঁর সিজদা দেখে যে কারও মনে হবে তিনি একজন ফিরিশতা। বসরা নগরবাসীর চেরাগ। বাতিঘর। যাঁর হৃদয়জুড়ে বাস করতো হিকমত ও প্রজ্ঞা। তাকওয়ার খোলসে বেঁধেছিলেন দুনিয়ার ডামাডোল। উলামাদের মধ্যমণি, উলামা-রত্ন। যুবসমাজের প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা এক যুবক। প-িতপ্রবর ও হাফেযে হাদীস। বসরা নগরীর যুবসমাজের প্রেরণার উৎস। তিনি আবূ বকর আইয়্যূব ইবনে আবী তামীমাহ কাইসান সিখাতিয়ানী। বসরা নগরী অধিবাসী। যুগশ্রেষ্ঠ ফুকাহা ও ইসলামী আইনজ্ঞ উলামাদের চেয়ারম্যান। নির্ভরযোগ্য তাবেঈ। হাফিয, যাহিদ ও দুনিয়াবিমুখ।
চল্লিশবার হজ্ব করেছিলেন। অলৌকিক ঘটনার জনক। বুযর্গ ও আল্লাহ্ওয়ালা ব্যক্তিত্ব। রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস শরীফ শোনে কাঁদতেন। হাস্যোজ্জ্বল বদনে থাকতেন। তাঁর শ্রুতিমধুর কথা ইতিহাসখ্যাত। বইয়ের পাতায় পাতায় যাঁর বিজ্ঞবচন ও প্রজ্ঞাপূর্ণ কথাবার্তা ঠাঁই করে নিয়েছে। যেমন তিনি বলতেন, অধিক ভক্ষণ পেটের পীড়া। দু’টি গুণে মানুষের নেতৃত্ব দেয়া যায়। মানুষের হস্তগত অর্থকড়ির প্রতি নিরাশা এবং তাদের প্রতি নির্লিপ্ততা।

একবার আইয়্যূব সিখতিয়ানী হযরত হাসান বসরী রহ. এর নিকট আসলেন। (প্রয়োজন সেরে) যাওয়ার সময় আইয়্যূব সিখাতিয়ানী শুনতে না পায় এমনভাবে হাসান বসরী রহ. বললেন, এ লোকটি গোটা বসরা নগরীর যুবসমাজের নেতা।

সুফইয়ান ইবনে উয়াইনা রহ. বলেন, আইয়্যূবের ন্যায় অন্য কাউকে আমি দেখিনি। ইমাম শুবা রহ. বলেন, আইয়্যূব সাইয়্যিদুল ফুকাহা। তিনি মুফতী সাহেবানদের প্রধান ব্যক্তি। যখনই তিনি আমাকে কোন কথা দিয়েছেন দেখা গেছে আমার আগে তিনি রয়েছেন। আসআ’স বলেন, আইয়্যূব উলামাদের মুকুটহীন সম্রাট। যুহদ ও দুনিয়াবিমুখিতার নমুনা। যার জবান দিয়ে প্রজ্ঞাপূর্ণ কথাবার্তা নিঃসৃত হতো। দুনিয়ার প্রতি নির্লিপ্ত ছিলেন। জাগতিক ঝুঁটঝামেলা ঝেড়ে ফেলেছিলেন।

হযরত আইয়্যূব সিখাতিয়ানী রহ. বলেন, দুনিয়ার যুহদ তিন প্রকার। পছন্দনীয় যুহ্দ হলো আল্লাহ্ তায়ালা ব্যতীত অন্যের ইবাদতে যুহদ করা। (শুধু আল্লাহ্ তায়ালার ইবাদত করা। তিনি ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত না করা)। সর্বোচ্চ যুহদ হলো হারাম কাজ ছেড়ে দেওয়া। সওয়াবের বিবেচনায় সর্বোচ্চ যুহদ হলো আল্লাহ্ তায়ালার হালালের ক্ষেত্রে যুহদ করা। তিনি বলতেন, যুহদ গোপন করার চেয়ে প্রকাশ করা উত্তম।

আত্মগোপনের পর্দায় তিনি ঘুরে বেড়াতেন। গোপনে আমল করতেন। ফলে রাতের বেলায় তিনি নামাযে আস্তে আস্তে ক্বিরাত পড়তেন। সুবহে সাদেকের সময় জোরে ক্বিরাত পড়তেন, যাতে মানুষ বুঝতে পারে, তিনি এইমাত্র ঘুম থেকে উঠেছেন। বেলা বাড়ার পর আইয়্যূব সিখাতিয়ানী রহ. সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে বসতেন। রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস শরীফ শোনে তারা নিজেদেরকে সুবাসিত করতে থাকতেন। গুটিকয়েকটি কথা বের হওয়ামাত্রই আইয়্যূব সিখাতিয়ানী রহ. এর দু’চোখ দিয়ে গ-দেশ বেয়ে অঝরে পানি পড়তো। নিজের ভালোবাসা ও যুহদ গোপন করার উদ্দেশ্যে তিনি বলতেন, মানুষ বুড়ো হয়ে গেলে চোখের পানি বেশি ঝরে। হাই তোলার ভঙ্গিমায় তিনি মুখে হাত রাখতেন (এবং নিজের কান্না চেপে রাখতেন)।
সুখ্যাতি চাইতেন না। নিজেকে জাহির করা অপছন্দ করতেন। নেতৃবর্গের কাছেও ঘেঁষতেন না। ইয়াযীদ ইবনে ওয়ালীদ হযরত আইয়্যূব সিখতিয়ানীর বন্ধু ছিলেন। তিনি যখন রাষ্ট্রপ্রধান হন এবং সেই খবর আইয়্যূব সিখতিয়ানী শোনতে পান তখন তিনি দু’হাত তুলে দোয়া করেন, হে আল্লাহ্! তুমি আমার স্মৃতি তার থেকে মুছে দাও। (অর্থাৎ ইয়াযীদ ইবনে ওয়ালীদ যেন আমাকে ভুলে যায় সে ব্যবস্থা করো)।
হিজরী ১৩১ সালে বসরা নগরীতে এক প্লেগ রোগের প্রাদুর্ভাব হয়। সে সময় আইয়্যূব সিখাতিয়ানী মারা যান। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।