দ্বীনি বিভিন্ন কাজ ও কর্মী: প্রতিদ্বন্দী নয়, পরস্পরের সম্পূরক-২

আমরা সবাই যেন পরস্পরকে ভালোবাসার সাথে, ইখলাস তথা আল্লাহ’র সন্তুষ্টির জন্য এবং তাকওয়া তথা আল্লাহ তাআলা-কে ভয় করে দ্বীনের কাজ করতে থাকি। এ কথা স্মরণ রাখব যে, যে কারো খুব ক্ষুদ্র কোন প্রচেষ্টা কবুল হয়ে যেতে পারে, আমার অনেক বড় কোন কাজও হতে পারে ব্যর্থতায় পর্যবসিত (হয়ত নিয়ত ভাল ছিল না, বা অন্য কোন ত্রুটি ছিল)। কারো শুধু নিয়তেই এমন অশেষ বরকত হতে পারে যে অন্য কেউ হয়ত সারাজীবন দ্বীনের কাজ করেও সেখানে পৌঁছতে পারবে না। এ কারণেই কারো প্রতি কারে বিদ্বেষ, অযৌক্তিক নালিশ ও দাবী থাকবে না। আমরা সবার প্রতি সুধারণা রেখে নিজেদের কাজ করে যাব। হ্যাঁ, কাউকে সংশোধন করার সুযোগ থাকলে, যদি আমার সেই যোগ্যতাও থাকে – সর্বোত্তম পন্থায় তাকে সংশোধন করার প্রয়াস চালাব। কিন্তু ছোট মানুষ বড় মানুষের যত্রতত্র মন্তব্য করবে, এক ময়দানের মানুষ আরেক ময়দানের মানুষকে হেয় করে কথা বলবে -তা সাধারণত সুফল বয়ে আনে না। এ কথা অবশ্য সর্বসাধারণের জন্য প্রযোজ্য; উলামায়েকেরাম ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও সবার অভিভাবক । সাধারণ মানুষ মনে রাখবে, জ্ঞানের পরিধি আমার যতটুকু, স্থান-কাল-পাত্র লক্ষ্য করে আমি সেই পরিধিতে ইখলাসের সাথে কথা বলতে পারি। তারপরও পূর্ণ সর্তকতা প্রয়োজন। আল্লাহ তাআলার ভয় তথা তাকওয়া ছাড়া আসলে তা সম্ভব নয়। আজ তো এমনও দেখা যাচ্ছে যে, যেই ব্যক্তি আলেম নন, সে আলেমদের বিষয়ে মন্তব্য ও সমালোচনা করে বসছে। যে বিষয়ে সে কিছুই জানেনা অথবা তার ধারণা ও জ্ঞান অসম্পূর্ণ, সে বিষয়ে মন্তব্য এমন কি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে চলে যাচ্ছে! এ অধিকার আমাদের কে দিয়েছে? ‘অহংকার’-এর কারণেই এটা হচ্ছে। এ অনুমতি আল্লাহ তাআলা বা তাঁর প্রিয় রাসূল ﷺ অবশ্যই দেননি।

কোন একটা মেহনতের ময়দানের প্রতি অনেক বেশী ঝোঁক ও আগ্রহ থাকা – এটা মোটেই দোষণীয় নয়; বরং এমনই হয়ে থাকে। এমনকি যেই ব্যক্তি যেই মেহনত তথা কাজের সাথে বেশী সম্পৃক্ত, সেই ব্যক্তির ঐ মেহনত তথা ময়দানের আকাবির ও উলামাদের সাথে মনের মিল ও অন্যান্য আকর্ষণ, দুর্বলতা বেশী থাকে এটাও খুব স্বাভাবিক। কিন্তু তারও একটা শরঈ সীমা – শরীয়ত নির্দেশিত সীমানা রয়েছে। এমন যদি হয় যে, আমি আমার মেহনতের ময়দানের বাইরে যে সব ময়দান রয়েছে, সেগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট উলামাদের ও নিয়োজিত কর্মীদের কাজ* ও মতামত সহ্যই করতে পারি না, তাহলে আমি কেমন মুসলমান?! সবাই করছে দ্বীনেরই কাজ, সবগুলো কাজই কুরআন ও হাদীস করতে বলছে, সব কাজই ফযীলতপূর্ণ, সবগুলোই গুরুত্বপূর্ণ‍, সব কাজ করার যোগ্যতা সবার নেই-ও! অথচ আমি আমার যা বুঝে আসছে বুলি আওরাচ্ছি – যত্রতত্র মন্তব্য ও সমালোচনা করছি। যে বিষয়ে আমার যোগ্যতা নেই, কথা বলার অধিকার নেই সে বিষয়ে কথা বলছি। এটা খুবই গর্হিত কাজ। খুব স্মরণ রাখার ও মনের মধ্যে গেঁথে নেয়ার বিষয়, দ্বীনের সকল ময়দানের উলামাদের ও কর্মীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করা প্রতিটি উম্মতের উপর অত্যাবশ্যকীয়। প্রত্যেকের কাজ হল নিজের কাজ করা, পারলে অন্যকে সহযোগিতা করা। অন্যের বিষয়ে বিরূপ মন্তব্য, বিচার করা সর্বসাধারণের দায়িত্ব তো নয়ই, বরং তা নিষিদ্ধ।

নিজের ময়দানকে (অর্থাৎ, আমি যে ময়দানে মেহনত করছি বা অধিক শ্রম ব্যয় করছি) শ্রেষ্ঠ ও পরিপূর্ণ মনে করা চরম এক মূর্খতা ও বোকামি। আল্লাহ তাআলার কাছে কবুলিয়াত সবচেয়ে বড় বিষয়। কার দ্বীনি-কাজ কতটুকু দরবারে এলাহীতে কবুল হচ্ছে – তা হাশরের ময়দানে প্রকাশ পাবে। কে কত বড় বুযূর্গ তাও সেখানে জানা যাবে। এগুলো নিয়ে চিন্তা-ফিকির ও বাছ-বিচারের দায়িত্ব মানুষের নয়। কিন্তু শয়তান আজ আমাদের দ্বীনি মূর্খতার সুযোগ নিয়ে দ্বন্দ্ব পাকিয়েছে এবং আরো পাকাতে চাচ্ছে। আমরা প্রত্যেকে যত্ন সহকারে সতর্ক হই! আল্লাহ তাআলার কাছে খুবই কাকুতি মিনতি করে পুরা উম্মতের জন্য দোআ করি। দোআ করি প্রতিটি ময়দানের প্রতিটি মেহনতকারী মুসলমানের জন্য।

নিজেকে সবচেয়ে ছোট মনে করে, অন্যদের সবাইকে ভাল মনে করে যখন মুসলমান তার নিজের কাজ করতে থাকবে, তখনই ইনশাআল্লাহ নবী-ওয়ালা দরদ ও চিন্তা ফিকির তার মধ্যে আসবে; সে যে ময়দানেই মেহনত করুক না কেন, ইখলাসের কারণে তার দ্বীনি কাজের ইতিবাচক প্রভাব নিজের উপর এবং পুরো উম্মতের উপর পড়বে। আর এটাই একজন মুসলমানের সার্থকতা। নিজের কাজ আন্তরিকতার সাথে করার পাশাপাশি অন্যদের সাধ্যমত সাহায্য-সহযোগিতা করাই আল্লাহ তাআলার পথে কবুলিয়াতের আলামত। এই ব্যক্তি ‘মুখলেস’, এই ব্যক্তি ফেতনা থেকে দূরে, এই ব্যক্তির সাহচর্য ফেতনা থেকে দূরে থাকারও মাধ্যম।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এক ও নেক উম্মত হিসেবে কবুল করুন! [আমীন]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *