কৃতজ্ঞতা আর কৃতজ্ঞতা: যার কোন শেষ নেই

আমাদেরকে আল্লাহ তাআলা আপন কুদরতে সৃষ্টি করেছেন। অসীম রহমতে এমন সুন্দর আকৃতি দিয়েছেন। তারপরও এত প্রচুর কল্যাণ ও নেয়ামত দিয়ে আমাদের ধন্য করেছেন যে, তা বলে শেষ করা যাবে না।

শোকরগুযার, অর্থাৎ, কৃতজ্ঞ হওয়া এক অন্যতম মহৎ গুণ। আল্লাহ তাআলার প্রিয় বান্দাদের সার্বক্ষণিকের আমল। সুখে-দুঃখে, শান্তিতে-বিপদে — সব সময়ই তাঁরা আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞ। শোকর এমনই এক গুণ, যার জন্য ওয়াদা রয়েছে নেয়ামত বৃদ্ধির। অতএব আমাদের জীবনের প্রতি পদে পদে থাকুক সেই শুকরিয়া আর কৃতজ্ঞতার শব্দাবলী।

আল্লাহ তাআলা যে কল্যাণ, দানসমূহ দিয়ে আমাকে ধন্য করেছেন, এগুলোর প্রতি একটু লক্ষ করা উচিত। প্রতিদিন পাঁচ মিনিট হলেও তা নিয়ে ভাবা উচিত। আমি সুস্থ আছি। আমি খেতে পারছি। আমি প্রস্রাব-পায়খানা করতে পারছি। আমি ঘুমোতে পারছি। আমি দেখতে পারছি। আমি হাঁটতে পারছি। আমি শুনতে পারছি। আমি শ্বাস নিতে পারছি……। এক একটি কত বড় নেয়ামত। কিন্তু এখানেই কি শেষ?! কেবল এগুলোই আমার নজরে ধরা পড়ছে। এছাড়াও শরীরের শিরায় শিরায়, প্রতিটি রক্ত কণিকায় যে কী তেলেসমাতি কান্ড ঘটে যাচ্ছে আমার জন্য ও আমার পক্ষে, বিশ্ব জগতে আরো কত কিছু হয়ে যাচ্ছে শুধুমাত্র আমার খাওয়া-পড়ার-জীবনধারণের জন্য — তার কোন খবর নেই আমার কাছে। সবই ঘটছে আমার আল্লাহ তাআলার মহান অনুগ্রহ ও হুকুমে। এ চিন্তা মুমিন প্রতিদিন করবে। এটাই আমাদের নেতা, আমাদের রাসূল হযরত মুহম্মাদ ﷺ এর শিক্ষা। তাঁর দোআ-গুলো এ কৃতজ্ঞতার শব্দাবলীতে ভরপুর। উঠতে, চলতে, বসতে — আল্লাহ তাআলারই গুণকীর্তন- তাঁরই প্রশংসা! বোঝানোর জন্য আমাদেরকে কত সহজ-সাবলীল ভাবে আল্লাহ তাআলা বলেন:

(হে নবী! মানুষকে) বলে দাও, আমার প্রতিপালকের কথা লেখার জন্য যদি সমুদ্র কালি হয়ে যায়, তবে আমার প্রতিপালকের কথা শেষ হওয়ার আগেই সমুদ্র নিঃশেষ হয়ে যাবে, তাতে সমুদ্রের কমতি পূরণের জন্য অনুরূপ আরও সমুদ্র নিয়ে আসি না কেন। সূরা কাহফ: ১০৯

জান্নাতে গিয়েও ঈমানদারগণ বলবে [অর্থ]: “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি আমাদের থেকে সমস্ত দুঃখ দূর করেছেন। নিশ্চয়ই আমাদের প্রতিপালক অত্যন্ত গুণগ্রাহী। (সূরা ফাতির: ৩৪)

বিভিন্ন নেয়ামত তথা দানের কথা আল্লাহ তাআলা আমাদের স্মরণ করিয়ে শোকরগুযার তথা কৃতজ্ঞ হওয়ার তাগিদ করেছেন:

আল্লাহই তো যিনি তোমাদের জন্য রাত সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাতে বিশ্রাম গ্রহণ করতে পারো, আর দিনকে বানিয়েছেন দেখার জন্য। বস্তুত আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রতি অনুগ্রহশিল, কিন্তু অধিকাংশ লোক শোকর করে না। (সূরা মুমিন: ৬১)

আমি সে ভূমিতে সৃষ্টি করেছি খেজুর ও আঙ্গুরের বাগান এবং এমন ব্যবস্থা করেছি যে, তা থেকে উৎসারিত হয়েছে পানির প্রস্রবণ – যাতে তারা তার ফল খেতে পারে। তাতো তাদের হাত তৈরী করেনি। তবুও কি তারা শোকর আদায় করবে না? (সূরা ইয়াসীন: ৩৪ – ৩৫)

আমরা যারা ঈমান ও ইসলাম পেয়ে ধন্য হয়েছি, তারা তো দুই জাহানের সবচেয়ে দামি জিনিস অর্জন করেছি। তারপর আর অবকাশ কোথায়! মুখে, অন্তরে, কাজে – সর্বাবস্থায় আমাদেরকে আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে সচেষ্ট হতে হবে।

যেকোনো সুস্থ বিবেকবান হৃদয় এ কথা সহজেই উপলব্ধি করতে পারে যে, দুনিয়ার কোন ব্যক্তি যদি নিঃস্বার্থভাবে তার কোন উপকার করে, সেই উপকারীর প্রতি তার অন্তরে কেমন কৃতজ্ঞতা জাগ্রত হবে। সেখানে মহামহিম আল্লাহ তাআলা, যিনি আমাদের সৃষ্টিকর্তা তথা পালনকর্তা, যার অনুগ্রহে আমরা মানুষ, মুসলমান, শেষ নবীর শেষ উম্মত – তাঁর প্রতি আমাদের কেমন কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত, তা সহজেই অনুমেয়।

আমাদের মহান পূর্বসূরীগণের জীবনী পড়লে বোঝা যায় কৃতজ্ঞতা উনাদের জীবনে কত বিস্তৃত ছিল! হযরত উরওয়া ইবনে যুবায়ের রহ. [উরওয়া রহ. বিখ্যাত সাহাবী হযরত যুবায়ের ইবনে আওয়াম রা. -এর সৌভাগ্যবান সন্তান – একজন তাবেয়ী, বড় আল্লাহওয়ালা। সাহাবী হযরত যুবায়ের ইবনে আওয়াম রা. দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ জনের একজন] যখন একটি পা হারালেন, অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া এই বলে আদায় করলেন যে, ঐ যাবৎ কত-দিন তিনি দু-পায়ে ভর দিয়ে চলেছেন, আর এ কথাও খুব আনন্দের সাথে উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলার খুব শুকরিয়া আদায় করলেন যে, এখনো তো আমার একটি পা আর দুটি হাত অবশিষ্ট আছে!

আসলে উনারাই “আলহামদুলিল্লাহ্” (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার) প্রকৃত অর্থ বুঝেছেন, হৃদয়ঙ্গম করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *