ইলমে-দ্বীন: আমাদের, আমাদের সন্তানদের ও প্রজন্মের সুরক্ষা

ইলমে দ্বীন অর্জন করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এঁর গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য যতই বর্ণনা করা হোক কম হবে। দ্বীনের ইলম অর্জনের মাধ্যমেই মুসলমান প্রকৃত ঈমানী ও আমলি জীবনের দিশা পায়। তাকওয়া, তাহারাত ও সুন্নাহসম্মত পরিপূর্ণ জীবনের ওপর পথ চলার জন্য ইলমে দ্বীন বা দ্বীনি লেখাপড়ার কোনো বিকল্প নেই। রাসূলে আকরাম ﷺ এর আদর্শের মানুষ গড়ে তোলার ঠিক যেমন কোনো বিকল্প নেই, ঠিক তেমনই ইলমে দ্বীন না শিখে রাসূলে আকরাম ﷺ এর আদর্শের মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার চিন্তা অবাস্তব ও অসম্ভব।

আজ বাহ্যিক সুরত, কথাবার্তা ও কিছু কাজকে আমরা দ্বীনের প্রায় সবকিছু বলে মনে করছি। দ্বীন শিক্ষার গুরুত্ব ও তার জন্য সময় ব্যয় করাকে উপেক্ষা করে এসব করা অসার, একরকম স্বেচ্ছাচারিতা। আমাদের মধ্যে দ্বীনদারির নাম-গন্ধ আর বাহ্যিক অবয়ব বাকি আছে কিন্তু দ্বীনের প্রকৃত গুরুত্ব ও আযমত (সম্মান) অনেকাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর মূল কারণ বা অন্যতম কারণ হলো দ্বীনের তালীম বা দ্বীনকে শেখা-শেখানোর আন্তরিক জযবা ও আত্মত্যাগ বিলুপ্তপ্রায়। এটি যেন এক বিশেষ শ্রেণির কাজ! অথচ দ্বীনের ইলম শিক্ষা করা মুসলমানদের সবার ওপর ফরয। সবার প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আলেম হওয়া জরুরি নয় — এটি সব মুসলমান জানে; আবার সবারই দ্বীনের ইলম অর্জন করেই নেক আমল করতে হবে এটিও তো সব মুসলমান জানে। আর নেক আমলসমূহের মধ্যে কেবল নামায-রোযা, তেলাওয়াত-যিকির, যাকাতহজ্জ অন্তর্ভুক্ত নয়, সামাজিক আচার-আচরণ, লেনদেন ও চরিত্র-গঠনও অন্তর্ভুক্ত; পাক-পবিত্রতা, পারস্পরিক সম্পর্ক ও হকসমূহ অন্তর্ভুক্ত। এগুলো জেনে আমল করার বিষয়। না জেনে, আন্দাজ করে ও বুদ্ধি ও যুক্তি খাটিয়ে দ্বীনের ওপর চলা শয়তানকে অনুসরণের নামান্তর।

আমরা যারা অভিভাবক তাদের ব্যাপক চিন্তা-ফিকির, সংশোধন ও পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন ও সুযোগ রয়েছে। যদি নিজ অবস্থা, নিজ পরিবারের অবস্থা ও পারিপার্শ্বিকতার দিকে তাকিয়ে আত্মন্নোয়ন ও সমাজ-উন্নয়নের জন্য কিছু করতে চাই তাহলে দ্বীন ও দুনিয়ার, দুনিয়া ও পরকালের সার্বিক সফলতার চাবিকাঠি হলো ইলমে দ্বীন অর্জন ও তার বিস্তারে সচেষ্ট হওয়া, নিবেদিত হওয়া। আজ উম্মতের যে করুণ অবস্থা বিরাজমান, চারদিকে যে নানারকম অভাব-অনটনের হাহাকার সবই তো মূলত আল্লাহ তাআলাকে নারাজ করার ফল! এ কথা কোনো মুসলমান অস্বীকার করতে পারে না। যত ফরয ও ওয়াজিব কাজ আমাদের দ্বারা তরক হয়েছে তার মধ্যে দ্বীনি ইলমের অর্জন নিঃসন্দেহে অন্যতম। দ্বীনি ইলম অর্জনে অবহেলা কথাটির অর্থ হলো, নিজেও এ পথে পা বাড়াইনি, সন্তান ও সমাজকে এ পথে অগ্রসর হতে সহায়তা করিনি। বরং আরো ভয়াবহ কথা হল, আমরা অনেক অভিভাবক আজ দ্বীনি ইলম প্রচার-প্রসারের পথে অন্তরায় সৃষ্টিকারী! নাউযুবিল্লাহ। কত গর্হিত কাজ এটা! নতুন প্রজন্মের জন্য দ্বীনি লেখাপড়াকে মাটি-চাপা দেয়াটাই যেন আজ বাকি আমাদের।

আমাদের সন্তানরা পেলে আর মেসির নাম জানে, সিদ্দীকে আকবার আর উমর রাদিআল্লাহু আনহুমার নাম জানে না। জানলেও শেষোক্ত ব্যক্তিবর্গকে নমুনা বানানোর কল্পনাটি পর্যন্ত খুব কম অভিভাবকগণের আসে! অথচ বললে অত্যু্ক্তি হবে কি, উনাদের বিপরীতে অমুসলমান ব্যক্তিদের অনেক নাম শোনামাত্রই আমাদের উত্তরসূরী নতুন প্রজন্ম তাদেরকে অনুসরণের উৎসাহে উদ্বেলিত হয়ে উঠে?

হবেই বা না কেন? আমাদের সন্তানদের পড়ার বিষয় তো সৌরজগৎ আর মহাকাশ নিয়ে! দুনিয়ার(??) খবর রাখার সময় তাদের কোথায়!

আমরা তাহলে কেমন অভিভাবক হলাম? বাহ্যত আমরা নিজ সন্তানদের শিক্ষা দীক্ষার ক্ষেত্রে জাগতিক বিষয়াদির জ্ঞানার্জনে খুব বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি। অথচ শেষমেষ আমাদের সন্তানদের একটি বড় অংশ  গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক জাগতিক জ্ঞান থেকেও বঞ্চিত থাকে। তদুপরি যে সুসন্তান(?)গুলো কল্পনার রাজ্যে পৃথিবী ভেদ করে মহাকাশ বিজ্ঞানের গুঢ় গবেষণায় লিপ্ত, তাদের অনেকের অবস্থা সন্তোষজনক নয়। কারণ ভালো ছাত্র মানেই তো আর ভাল মানুষ নয়! দেখা যাচ্ছে লেখাপড়া, উচ্চতর ডিগ্রী ও প্রভাব প্রতিপত্তি খুব আছে, কিন্তু মনুষ্যত্বের বিকাশ হয়নি কিছুমাত্র। এজন্যই এ করুণ অবস্থা তাদের।

অভিভাবকদের অবশ্য দাবী, তাদের এই কৃতি সন্তানরা দেশ ও জাতির সেবায় নিয়োজিত নিঃস্বার্থ ও নিরলস আদর্শ নাগরিক হতে যাচ্ছে। অথচ ব্যক্তি জীবনে সৎ ও আদর্শ হওয়ার অনুশীলনটুকু যে সন্তানকে দেয়া হয়নি, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের গুরু দায়-দায়িত্ব তাকে দেয়াতো বহু পরের কথা!

যার কিনা সাধারণ আচার-ব্যবহারই বেঠিক হবে, চরিত্র বিগড়ানো হবে – দেশ-জাতি বাদ থাক, একটি পরিবার তার কাছে কী আশা করতে পারবে?!

আলামতেই বাস্তবতা অনুভূত হচ্ছে। সন্তানরা ঘরের খবর রাখতে পারছে না, কিন্তু বিশ্বের অনেক অপ্রয়োজনীয় খবর রাখতে তারা মাতোয়ারা-দিশাহারা। বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ-সংযোগ যেমনই থাকুক, সামাজিক মাধ্যমে সে খুবই চাঙ্গা! এসবই কেবল আমাদের মনুষ্যত্বের অবনতি, বিবেক-বুদ্ধির ভ্রষ্টতা ও অন্যায়-অনাচারের মূল কারণ বলে দিচ্ছে। কিন্তু আমরা এগুলোকেই উন্নতি, উৎকর্ষতা আর যুগ পরিবর্তনের মোড়কে নানান নামকরণ করে আনন্দ-উল্লাসে মেতেছি। বাস্তবতা হল, যে শিক্ষা আমাকে ও আমার জাতিকে সত্য-মিথ্যার উপলব্ধি দেয় না এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে সহায়তা করে না, তা কেবল নামেই শিক্ষা। তা গ্রহণে বরং অনেক সময় এমন সব আবর্জনা ও চিন্তা অন্তরে বসে যায় তা দুনিয়া আর আখেরাতকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আমরা কিন্তু জাগতিক শিক্ষার বিরুদ্ধে বলছি না! বলছি এতটুকু যে, মুমিন যে জাগতিক শিক্ষা  গ্রহণ করবে, তা কখনো কুরআন-হাদীসের সাংঘর্ষিক হতে পারে না। আর সব মানুষের জন্যই, হোক কেউ মুসলমান কিংবা অমুসলমান, মিথ্যা ও অর্থহীন বিষয় কখনো প্রকৃত শিক্ষা ও জীবনকে ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যম হতে পারে না। কিন্তু খুবই দুঃখজনক, আজ তা-ই মনে করা হচ্ছে, সেভাবেই উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে প্রজন্মকে এবং অশিক্ষা ও কুশিক্ষাকে শিক্ষা নামে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

আসুন প্রত্যেকে নিজে সচেতন হই ও অধীনস্থদের সচেতন করি। মুসলমানের জীবন প্রশস্ত হবে, সংকীর্ণ নয়। সততা, স্বচ্ছতা ও আন্তরিকতা যে জীবনে নেই, সে জীবন সংকীর্ণতায় পূর্ণ। মিথ্যা, ছল-চাতুরি আর কৃত্রিমতা বর্জিত জীবনই আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের শিক্ষা; এ থেকে মুক্ত হওয়া মানেই ধ্বংসের মাধ্যমগুলোর সাথে যুক্ত হওয়া। যারা আল্লাহ ও রাসূলকে মানে না তাদের সাথে আমাদের জীবনের কেন মিল থাকবে?! যদি, আল্লাহ না করুন, এমনটাই হয়, তাহলে আমাদের পরিণতিও তো (মা’আয আল্লাহ) একই হবে?!

আমরা যেন মনে না করি যে, ইসলামের শিক্ষা অর্জন করা মানে শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে যাওঅ। এটা এক মিথ্যা অপবাদ ও নিকৃষ্ট ধারণা। এটা হল পশু প্রবৃত্তি চরিতার্থ করতে ইচ্ছুক মানুষরূপী ব্যক্তিবর্গের প্রলাপ ও ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের উদ্দেশ্য প্রণোদিত জ্বলজ্যান্ত মিথ্যাচার।

ইসলামে ‘হায়া’ (লাজ-লজ্জা ইত্যাদি) থেকে শুরু করে পর্দা ও চোখের হেফাজতের বিধান মানুষকে পবিত্রতার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে দেয়। যৌবনে পা রাখার আগেই এ সুমহান প্রাথমিক শিক্ষা নতুন প্রজন্ম পায় মাতা-পিতা-শিক্ষক-অভিভাবকদের কাছ থেকে – বাস্তবতা অবলোকনের মাধ্যমে। বয়োজোষ্ঠদের তাকওয়া ভিত্তিক চাল-চলন, কথা-বার্তা ও সঙ্গই সবসময় পরবর্তী প্রজন্মের সন্তানদের সভ্যতা, ভদ্রতা, নম্রতা শিক্ষার মৌলিক ভিত্তি স্থাপন করে আসছিল। কিন্তু যেই উম্মত মনে করল যে, আমরা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত পূর্বসূরীদের অনুসরণের ফলে দুনিয়ায় পিছিয়ে যাচ্ছি, তখন থেকেই সব দিকে ‘মূল পিছিয়ে যাওয়া’র সূচনাটি হল! কারণ, মুসলমানদের অগ্রসর হওয়া, উন্নতি হওয়া বলুন অথবা পিছিয়ে যাওয়া, অবনতি হওয়া বলুন — পুরোটাই নির্ভর করে কেবল তাদের ঈমান ও নেককাজের অগ্রগতি বা অবনতির উপর। যদি দ্বীনের মাহাত্ম্য, গুরুত্বই অন্তরে না থাকে, এ উপলব্ধি আসবে কি করে! আর দ্বীন-শিক্ষাকে ব্যাপকভাবে অবহেলা করা হলে তো কথাই নেই, আক্বীদা তথা মৌলিক বিশ্বাস, জীবন ও সমাজ গঠন সংক্রান্ত ইসলামী চিন্তাধারা ও লক্ষ্যই তো বুঝে আসবে না।

পরিচয় তো সর্বপ্রথম হতে হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলে প্রতি! পরিচয় যদি প্রথমেই হয় ফেরাউন-হামান-আবু জাহেল বৈশিষ্ট্যধারী মানুষরূপী অমানুষদের সাথে তাহলে জীবনের লক্ষ্য ও প্রচেষ্টা তো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল-মুখী হবে না; এতে তো আশ্চর্যের কিছুই নেই। একজন মুসলমান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সঠিক পরিচয় পাবে কোথায়? স্কুল-কলেজ-ইউনিভারসিটি, ইন্টারনেট, পত্র-পত্রিকা, বই-পত্র — এগুলোতে কি? যদি দ্বীনের শিক্ষা এগুলো কিছুমাত্র থেকেও থাকে খুব ভালো করে বুঝে নিন যে, কুরআন ও সুন্নাহর পবিত্র জ্ঞান আন্তরিকতা এবং সাধনা ছাড়া আসে না। কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞান সন্ধানে ও অর্জনে আল্লাহ তাআলার পথ অবলম্বন করতে হয়। শুধু অনেক আগ্রহ ও কাজ করলেও কেবল কিছু বাহ্যিক ফায়দা হয়ে থাকে; জীবন ও জাতি গঠনে তা কখনো যথেষ্ট নয়।

খুব লক্ষ্য করুন, আমাদের প্রিয় নবীজি ﷺ কী বলেছেন:

আব্দুর রহমান বিন আবী বাকরার পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আলেম হও, নতুবা ছাত্র হও, নতুবা আলেমের অনুসারী শ্রোতা হও, অথবা আলেমকে মোহাব্বতকারী হও, কিন্তু পঞ্চম ব্যক্তি হয়ো না, তাহলে ধ্বংস হয়ে যাবে। শোয়াবুল ঈমান

সাইয়্যিদুনা মু’আবিয়া রাদি আল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন যে তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ বলতে শুনেছেন:

হে লোকেরা, জ্ঞান কেবল তার সন্ধানের মাধ্যমেই অর্জন করা যায় এবং দ্বীন সম্পর্কে প্রকৃত উপলব্ধি কেবল গভীর অধ্যয়ন  দ্বারা লাভ করা যায় এবং আল্লাহ তাআলা যার জন্য মঙ্গল কামনা করেন, তিনি তাকে সত্য উপলব্ধি ও সঠিক জ্ঞান দান করেন।  আল্লাহর তাআলার বান্দাদের মধ্যে কেবল উলামাগণ (যারা সঠিক জ্ঞান রাখেন) তাঁকে ভয় করে। তাবারানী

আমরা ইলম, তালিবুল ইলম (দ্বীনের জ্ঞান অন্বেষণকারী), আলেমগণের প্রতি যেন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রাখি এবং প্রত্যেকে সাধ্যমতন দ্বীনের জ্ঞান অর্জনে ব্রতী হই; নিজ পরিববারবর্গ, অধীনস্থ ও বন্ধুদেরকে এ ব্যাপারে বিশেষভাবে সাহায্য ও উৎসাহ প্রদান করি!আল্লাহ তাআলা তাওফীক দান করুন। আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *