আল্লাহ্-র জন্যই বন্ধুত্ব, আল্লাহ্-র জন্যই শত্রুতা

মুসলমান মাত্রই আল্লাহ্ তা’আলার সন্তুষ্টির অন্বেষণকারী। আল্লাহ্ তা’আলার সন্তুষ্টিকে ঘিরেই একজন মুসলমানের সবকিছু। দুনিয়াতে যে যত কাজই করুক না কেন, যে যত মত বা পথের অনুসারী হোক না কেন, আসলে সে কাউকে সন্তুষ্টির নিমিত্তেই করছে।

যে যত কাজ বা প্রচেষ্টা করে থাকে না কেন, প্রতিটা কাজ ও প্রচেষ্টার একটা আসল তথা মূল উদ্দেশ্য রয়েছে; আর সেই উদ্দেশ্য কারো না কারোর সন্তুষ্টিকে ঘিরেই। আমরা যত কাজই করি না কেন, প্রতিটির উদ্দেশ্যেই “কারোর জন্য”, যদি তা নিজের জন্যও হয়ে থাকে সেটাও-তো “নিজের জন্য”, অর্থাৎ, কোন মানুষের জন্যই হল!

মুসলমান যে হবে, তার সব কাজের লক্ষ্যস্থল তথা উদ্দেশ্য হবে একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার সন্তুষ্টি। তার যাবতীয় কাজই হবে “আল্লাহ্-র জন্য”, হ্যাঁ আল্লাহ্ তা’আলার সন্তুষ্টির অধীন। অন্য কাউকে খুশী করা, বা আরাম পৌঁছানো, বা অন্য কারোর মনের ইচ্ছা পূরণ – সেটা যা-ই হোক না কেন, সবই করতে হবে আল্লাহ্ তা’আলাকে সন্তুষ্ট করেই। অর্থাৎ, এমন যদি হয় যে, কোন ব্যক্তিকে খুশী করতে গেলে আল্লাহ্ তা’আলা অসন্তুষ্ট, সেটা করা মুসলমানের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, অন্য কারোর খুশী যদি আল্লাহ্ তা’আলার অসন্তুষ্টির কারণ হয়, তাহলে সেটা অবশ্যই আল্লাহ্ তা’আলার নাফরমানি, গুনাহই বটে! এমন হয়ে গেলে একজন মুসলমানের জন্য তওবা-ইস্তেগফার করা জরুরী।

মুসলমানের সজাগ দৃষ্টি আল্লাহ্ তা’আলার সন্তুষ্টির দিকে। নিজেকে খুশী করে কাজ করাও সেই সীমা পর্যন্ত জায়েয (শরীয়তে অনুমতি প্রাপ্ত) , যে পর্যন্ত আল্লাহ্ তা’আলা নারাজ ও অসন্তুষ্ট হবেন না। কিন্তু আমি এমন কিছু করব, এমন আনন্দ গ্রহণ করব, এমনভাবে নিজেকে খুশী করব যে, আল্লাহ্ তা’আলা আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন – এটা মুসলমানের কাজ নয়। জেনে-বুঝে একজন মুসলমান এমন করবে না। এমন হয়ে গেলে একজন মুসলমান তওবা-ইস্তেগফার করবেই।

মুসলমান যে কারোর প্রতি (হোক তা কোন ব্যক্তি বা দল) বন্ধুত্ব ও শত্রুতা পোষণ করবে, তার ভিত্তি অবশ্যই আল্লাহ্ তা’আলার সন্তুষ্টি। যদি আমি কারো সাথে বন্ধুত্ব রাখি, সেটা আল্লাহ্ তা’আলার সন্তুষ্টিকে সামনে রেখেই রাখব। আমি কারোর সাথে দূরত্ব বজায় রাখি, সেটাও আল্লাহ্ তা’আলার সন্তুষ্টিকে সামনে রেখেই রাখব। এই বিষয়টি লক্ষ্য না রাখার জন্য মুসলমান আজ ক্ষতিগ্রস্ত। যেখানে সম্পর্ক জুড়তে বলা হয়েছে, সেখানে আমরা সম্পর্ক ভেঙ্গেছি। যেখানে সম্পর্ক গড়ার বিষয়ে সচেতন থাকতে বলা হয়েছে, সেখানে আমরা খুব সম্পর্ক করেছি। ফলে মুসলমানের ইহকাল ও পরকাল – উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আল্লাহ্ তা’আলার বিধান লঙ্ঘনকারীকে বন্ধু মনে করা চরম বোকামি। কিন্তু আমরা অনেক ক্ষেত্রে তাদের তাঁবেদারিও করে বসি। যেই ব্যক্তি আল্লাহ্ তা’আলার সন্তুষ্টিকে জীবনের উদ্দেশ্য বানায়নি, তার সাথে বন্ধুত্ব করে কিভাবে আমি আল্লাহ্ তা’আলার সন্তুষ্টির পথে চলব? আমি তো মুখে বলছি যে, আমি আল্লাহ্ তা’আলার ফরমাবরদার। কিন্তু আমার সম্পর্ক একই সাথে আল্লাহ্ তা’আলার সাথে, একই সাথে তাঁরই নাফরমান তথা শত্রুদের সাথে! এই দ্বৈত সম্পর্ক আমাকে কিভাবে সফলতা দিবে(?!)

হ্যাঁ আমাদের প্রত্যেককে বেছে নিতে হবে খাঁটি হবার ও খাঁটি থাকবার পথ। দুনিয়াতে দেখবেন ভেজাল কেউ পছন্দ করে না। ভেজাল তেল, ভেজাল ঘি কেউ চায় না। আর আল্লাহ্ তা’আলার সাথে সম্পর্ক গড়ব, ভেজাল সম্পর্ক? আল্লাহ্-র দলেও থাকব, ঐ দলও করব? আল্লাহ্ তা’আলাকে ভালবাসতে চাবো – বিপরীত ভালোবাসাকেও লালন করব? এটা আল্লাহ্ তা’আলাও চান না। বরং, এটা-তো স্রষ্টার সুস্পষ্ট সীমালঙ্ঘন! এই রকম দ্বিমুখী সম্পর্ক বড়ই ঝুঁকিপূর্ণ! এখানেই কপটতা তথা মুনাফিকর বীজ! আল্লাহ্ তা’আলার পানাহ!

আমাদের অবস্থা হল, “আমরা দুনিয়াও চাই, আখেরাতও চাই — আমাদের মন মতন, আমাদের ফর্মুলা মতন”। বরং বলা যায়, “আমরা দুনিয়া অবশ্যই চাই, যেমন কাফির-মুশরিকরা চায় (দুনিয়ার বাড়ী-গাড়ি, নারী, ক্ষমতা সব বেশী চাই), আখেরাতের ক্ষতি হলেও তার মূল্যে দুনিয়া হাত ছাড়া করতে রাজি নই”। হে মুসলমানগণ! এটা আসলেই ধোঁকা! আর এই ধোঁকা মারাত্মক ব্যাধি! এই ব্যাধি হল দুনিয়াকে প্রাধান্য দেওয়ার ব্যাধি, দুনিয়াকে প্রবলভাবে ভালোবাসার ব্যাধি। অথচ, একজন মুসলমান প্রবলভাবে তো আল্লাহ্ তা’আলা ও তাঁর রাসূল ﷺ-কে ভালবাসবে! আল্লাহ্ তা’আলার সন্তুষ্টি ও আল্লাহ্ তা’আলার রাসূল ﷺ-এর সন্তুষ্টির সামনে কোন সন্তুষ্টিকে সে স্থান দেবে না।

দুনিয়ার হায়াতেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমাকে, আমি কার সন্তুষ্টি চাই? আমার জীবনকে কার কাছ ন্যস্ত করব? আমার মতনই অসহায় কোন মানুষের হাতে, নাকি মহামহিম, মহা-পরাক্রমশালী আল্লাহ্ তা’আলার কাছে?

যদি মুসলমান হয়ে মরতে চাই, যদি ঈমান ও নেক আমলকে জীবনের পুঁজি বানাতে চাই, শুধু একটি পথই বেছে নিতে হবে। সেটিই আল্লাহ্ তা’আলার পথ। সেই পথটিই ইসলাম দেখিয়েছে – সীরাতুল মুস্তাক্বীম। সেই পথে চলে দেখিয়েছেন আমাদের প্রিয় নবীজি ﷺ এবং তাঁর সাহাবা (রা.) গণ, পরবর্তীগণও সেই পথ ধরেই হয়েছে সফল ও সার্থক। আর এটা এমন সফলতা ও সার্থকতা যা শুধু দুনিয়াতে সীমাবদ্ধ নয়। দুনিয়া ও আখেরাতে বিস্তৃত। সেই সফলতা চিরকালের। সেই সফলতা ও সার্থকতা যে কত বড়, তা ঈমানী দুর্বলতার জন্য আমরা আজ উপলব্ধি করতে পারছি না। কিন্তু কেয়ামতের দিনটি সন্নিকটে। সেই দিনই বুঝে আসবে সম্মান আল্লাহ্ তা’আলাই দেন, কাকে দেন, কিভাবে দেন। সেই দিনই বুঝে আসবে আল্লাহ্ তা’আলার সন্তুষ্টির পাত্রগণ কারা, তাঁদের মর্যাদা কি।

 وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لا يَعْلَمُونَ

অর্থ: মর্যাদা কেবল আল্লাহ্ তা’আলার, তাঁর রাসূলের এবং মু’মিনদেরই; কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না। সূরা মুনাফিকুন: আয়াত ৮ (আংশিক)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *