আপনার সন্তান হোক আপনার আসল পুঁজি

আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে ঈমানের নূর দান করেছেন। সে নূরের পথে চলে (অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার আদেশ-নিষেধ মতন জীবনযাপন করে)  মুসলমানগণ দুনিয়া ও আখেরাতে রহমত পাওয়ার আশা করে থাকে। ইসলামের পথই হলো আল্লাহ তাআলার পথ। এ পথে চলেই আমাদেরকে সেই রহমত অর্জন করতে হবে। তাহলেই আমরা উভয় জগতে সফল হব ইনশাআল্লাহ। ঈমানের ভিত্তিতেই মুসলমান তার নিজ জীবন ও পরিবারের জীবনকে গড়ে তুলবে। অন্য যত পথ ও মত রয়েছে, সবই পরিত্যাজ্য ও পরিত্যক্ত। এ বিষয়ে কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তার অন্তরে থাকবে না।
মুসলমানগণ ব্যাপকহারে আজ বিভ্রান্ত। আমাদের অভিযোগ আমাদের অভাব দূর হয় না, সমস্যার সমাধান হয় না। আমাদের জাতিগত উন্নতিও নেই। আমরা দুনিয়ার আয়-উন্নতিতে অনেক পেছনে পড়ে যাচ্ছি। এ অসহায় অবস্থাটি আমাদের কেন হবে ও কেন হয়েছে, সেটাতো আমাদের সালাফ আমাদেরকে চোখে আঙুল দিয়েই দেখিয়েছেন। কুরআন ও হাদীস তো মৌলিকভাবে এই শিক্ষাতেই ভরপুর। আমরা তো রোগের কারণ জানি কিন্তু চিকিৎসা করছি বিপরীত পথে। যে পথে রোগ বৃদ্ধি পাবে, চিকিৎসা তো সেই পথে করা হচ্ছে।
আমাদের মূল সমস্যা হলো আমরা জাগতিক অর্থ-সম্পদ-আয়-উন্নতিকে মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সাব্যস্ত করে রেখেছি। পার্থিব উন্নতিই মূল — এ বিশ্বাস এতটাই দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরেছি যে, এখন সব সমস্যার সমাধান শুধু পার্থিব আয়-উন্নতিকে কেন্দ্র করেই বুঝি আমরা। তখন কুরআন ও হাদীসের কথা কিভাবে মানা হবে?! শোনাই তো এক বোঝা মনে হবে, যেটা বর্তমানে হচ্ছে। আমরা তো দ্বীনের কথা সবাই কম-বেশি শুনছি। কিন্তু তাতে আমাদের কতটুকু প্রভাব পড়ে? আমি পরিবারের কর্তা হয়ে আমার ওপরই দ্বীনের কথার তেমন প্রভাব নেই। আমার স্ত্রী ও সন্তানদের ওপর আর কতটুকু প্রভাব পড়বে?
যারা আখেরাত অস্বীকারকারী, সেই অমুসলমানদের কৃষ্টি-কালচার তো বটেই, তাদের শিক্ষা ও শিক্ষা-পদ্ধতিকে আমরা রীতিমত ভালোবেসে ফেলেছি। নিজের জন্য ও সন্তানদের জন্য যে বিষবৃক্ষ আমি রোপর করেছি এখন তা থেকে বিষফলই উৎপন্ন হয়ে চলছে। আমি তাহলে কিসের নালিশ করছি ও কেন?
আমরা আজ অনেক বুদ্ধি খাটিয়েও কিছু করতে পারছি না কিন্তু সাহাবাগণ অল্প বুদ্ধি খাটিয়ে কী করেছেন, চিন্তা করুন। এমন না যে তাদের বুদ্ধি কম ছিল। বরং আমাদের মতন তারা বুদ্ধি-নির্ভর ছিলেন না। তারা ঈমান-আমল নির্ভর ছিলেন, অর্থাৎ তারা কেবল আল্লাহ তাআলার ওপরই নির্ভর করেছেন। বুদ্ধির ওপর নির্ভর করে বুদ্ধি খাটাননি। আল্লাহর ওপর নির্ভর করে বুদ্ধি খাটিয়েছেন। সাহাবাগণের পরে যে বা যারাই সেই পথ ধরেছেন, তারা সফল বৈ বিফল হননি। সবাই আল্লাহ তাআলার পথে উৎসাহী, উদ্যমী ও সাহসী ছিলেন। খোদাভীরুতা ও নেক আমলে ছিলেন অবিচল ও অটল।
আমরা সেটা করছি না। অথচ আমরা দাবী করছি আমরাও ঈমানদার। যে কাজ কাফেররা করে, আমরা সেটা করছি। কাফেররা কেবলই বুদ্ধি খাটায়। একটি বুদ্ধিতে কাজ না হলে তারা আরেকটি বুদ্ধিবৃত্তিক পথ অবলম্বন করে থাকে। আমরাও আজ সেই পথ ধরেছি। আমাদের জন্য এটা কোনো সুফল তো বয়ে আনবেই না, বরং তা আমাদেরকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে এবং হচ্ছে তাই। আমরা বুদ্ধিকে পুঁজি করে যত কিছু করছি তাতে পরকালীন সফলতা তো দূরাশা, পার্থিব কল্যাণ অর্জনই সম্ভব নয়।
আমাদের মেধা বিকাশে এটা প্রধান অন্তরায়। আমরা ঈমান ও তাকওয়াভিত্তিক ব্যক্তি ও সমাজ গঠনে মনোযোগী নয়। দ্বীনদার দাবী করেও আজ আমি নিজ সন্তানকে এমন শিক্ষার ব্যবস্থা করেছি যেখানে গেলে আমার সন্তান বিপথে যাবে। আমি বুদ্ধি করেছি আমার সন্তানকে আমি এভাবেই দ্বীন ও দুনিয়া শেখাব। মূল হলো তাকে দুনিয়া শিক্ষা দেওয়া। দ্বীন শেখাব তাকে ‘পার্ট-টাইম’। কারণ (আমি এটাই বুঝেছি যে) দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করালে সন্তান আমার বঞ্চিত হয়ে যাবে। দুনিয়া বুঝবে না, দুনিয়ার সম্মান অর্জন করতে পারবে না। কেবল দ্বীনি শিক্ষা দিয়ে রুটি-রুজি হবে না। ‘আমি বঞ্চিত হব’ এটাই অন্তরের কথা, কিন্তু বলছি “সে বঞ্চিত হবে’। খুব ভালো করে জানা দরকার, এমন ধারণা এখন আমাদের মতন ‘বাহ্যত দ্বীনদারদের’ই। খাঁটি দ্বীনদারদের নয়।
আসলে দুনিয়াকে ছাড় দিতে আমরা রাজি নই। অবশ্য আখেরাত ছাড়তে রাজি আছি; সেখানে কিছু ক্ষতি হোক – কিছু যায় আসে না। এখানে যুক্তি হলো, ‘মুসলমানের দুনিয়াই তো দ্বীন’!‍ হায় মুসলমান। তুমি এ কথা বুঝেছো যে ‘মুসলামনের দুনিয়াই দ্বীন’, কিন্তু এ কথা বুঝলে না যে কোন্ জ্ঞানকে ইলম বলে আর কোন্ ইলম অর্জন আল্লাহ তাআলা তোমার ও তোমার সন্তানের জন্য ফরয করেছেন?!
আল্লাহর জন্য দুনিয়া ছাড়লে যে ক্ষতি হবে না, আল্লাহ সাহায্য করবেন — এ কথার তেমন একটা বিশ্বাস নেই অন্তরে। তাই সন্তানকে আমি দুনিয়া শিখিয়ে তাকে আমি দুনিয়ার জন্য ঠিকই প্রস্তুত করছি, কিন্তু সেই অনুপাতে আখেরাতের জন্য আমি তাকে প্রস্তুত করছি না। এর মাধ্যমে নিজেরও হয়ত দুনিয়া ‘কিছু’ হলো, কিন্তু আখেরাতের প্রত্যাশী আমি নই। বুদ্ধি খাটিয়ে আমি ক্ষণস্থায়ীকে প্রাধান্য দিলাম। সবচেয়ে বড় আফসোস হলো, এর জন্য আমার তেমন কোনো আফসোসও নেই!
হে মুসলিম পিতা ও মাতা!
আসুন না আমরা একটু নিজেদের চিন্তাচেতনা ও প্রচেষ্টাগুলোর মুহাসাবা (কুরআন-সুন্নাহর আলোকে নিজের হিসাব নেওয়া) নেই। জীবনের বড় একটি সময় চরম গাফলতে অতিবাহিত হয়ে গেল। এখনও কী আমাদের সময় হলো না নিজেদের চূড়ান্ত সফলতার চিন্তা করে কাজ করার? যেমনিভাবে স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সূরা হাদীদে বলেছেন: যারা ঈমান এনেছে তাদের জন্য কি এখনও সেই সময় আসেনি যে, আল্লাহ তাআলার স্মরণে এবং যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে তাতে তাদের অন্তর বিগলিত হবে? [সূরা হাদীদ: ১৬]
আপনার সন্তানকে দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে কোনো আপোষ করে না। আপনার সন্তানকে নেক সন্তান হিসেবে গড়ে তোলার সর্বাত্মক চেষ্টাটুকু করে দুনিয়া থেকে বিদায় নিবেন — এ মানসিকতায় – দৃঢ় সংকল্প অর্থাৎ, নিয়্যত আজই করুন। এজন্য এখনই দুআ শুরু করুন ও কোনো আলেমের শরণাপন্ন হোন। কোনো উপায় বুঝে না আসলে আন্তরিক দুআ করতে থাকুন আর সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা অব্যাহত রাখুন। দেখবেন আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য পথ খুলবেন (ইনশাআল্লাহ)।
আজ আমাদের সন্তানেরা যে আমাদের জন্য বিপদ ও বোঝা হিসেবে গড়ে উঠছে, এর প্রথম ও প্রাথমিক দোষ আমাদেরই। তাই এ থেকে খাঁটি তওবা করে এখন সংশোধনের পথ অবলম্বন করতে হবে। পার্থিব সবই পরীক্ষা। সন্তান-সন্ততিও পরীক্ষা। বরং সন্তান-সন্ততি যে পরীক্ষা তা কুরআন মাজীদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে (সূরা আনফাল ২৮)।
আমরা সন্তান-সন্ততিকে আদরের বস্তু, গৌরবের বস্তু ইত্যাদি নামে ভুষিত করে থাকি। অবশ্যই সন্তান-সন্ততি আদরেরও বস্তু ও গৌরবেরও বস্তু। কিন্তু কোন্ আদর আর কোন্ গৌরব? যদি আমার সন্তান নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হয়ে যায় আর আমার অবাধ্য হয়, তাহলে তাকে নিয়ে আমার কিসের গর্ব? আচ্ছা এই সন্তান যদি আমার গৌরব ও আদরের হয়েই থাকে আর আল্লাহ তাআলার নাফরমান একজন বান্দা হয়, তাহলে বলুন এমন আদর আর গৌরব কেয়ামতের দিন আমার ও সন্তানের কী কাজে আসবে? একটু চিন্তা করুন। একটু সময় নিয়ে ভাবুন। সন্তানকে আদর ও তার ব্যাপারে গর্বও তো একজন মুসলমান মা বা বাবা করবেন ইসলামেরই ভিত্তিতে! নাকি মুসলমান হব কেবল মৌখিক আর জীবন চলার পথটি হবে অমুসলমানদেরই? তাহলে কি মুসলমান হয়ে মৃত্যুর আশা করাটিই মিথ্যা হয়ে যাবে না?!
ইসলাম কেবল সত্য কথাই বলে না। ইসলাম বাস্তবতার নিরিখে কথা বলে ও আহ্বান করে। এটা ইসলামের শত্রুরাও অনেকে জানে ও বুঝে। তাদের স্বার্থ তাদেরকে আটকে রেখেছে। সেই বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে তারা ইসলামের ওপর আজ মিথ্যা আরোপ করছে। অবশ্য তাদের মধ্যেও কিছু সরল প্রাণ ও সত্যানুসন্ধানী মানুষ রয়েছে। তারা ইসলামকে জেনে অচিরেই হেদায়াত পাচ্ছে । প্রশ্ন হলো, আমরা মুসলমান হয়েও কি ইসলামকে বুঝব না? অন্ধ থেকে যাব?! চলব ঐ পথে যা স্পষ্টত বিপথ?!
ইসলাম আল্লাহ তাআলার মনোনীত দ্বীন। পার্থিব ও পরকালীন চূড়ান্ত সমাধান দানকারী। এত সুন্দর ইসলামের পথটি ছেড়ে দিয়ে আমার সন্তানকে হাতে ধরে আমি কোথায় নিয়ে চলছি? সেটা আমার জন্য কতটুকু কল্যাণকর হচ্ছে? যে পথে মানুষ আমাকে প্রতিশ্রুতি দেয় সেই পথটি অধিক নিরাপদ নাকি যে পথে আল্লাহ তাআলা আমাকে প্রতিশ্রুতি দেয় সেই পথটি নিরাপদ?
…তাই আর বিলম্ব নয়। আসুন নিজের ও সন্তানের পার্থিব ও পরকালীন সফলতার জন্য আল্লাহ তাআলার আশ্রয় গ্রহণ করি। আল্লাহ তাআলা তাওফীক দান করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *