সময়ানুবর্তিতা-১

সময়ানুবর্তিতা মানবজীবনের অতি প্রয়োজনীয় একটি গুণ। মানবজীবনের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হল সময়ের কাজ সময়ে না করা। যারা ইতিহাসের পাতায় বরেণ্য ও ধন্য হয়েছেন তাদের জীবনে সময়ানুবর্তিতা লক্ষ্য করুন, বোঝা যাবে কিভাবে তারা সময়কে মূল্য দিয়েছেন। আমাদের জীবনে ব্যর্থতার হিসাব-নিকাশ করলে সহজেই বেরিয়ে পড়বে কিভাবে আমরা সময়কে অবহেলা করেছি ও করছি।

আমাদের সালফে সালেহীন (নেককার পূর্বসূরীগণ) সময়কে সঠিক ভাবে কাজে লাগানোর বিষয়ে খুবই তৎপর ও সজাগ ছিলেন। আমরা, আল্লাহ আমাদের ক্ষমা ও সংশোধন করুন, সময়কে যথেচ্ছ ব্যবহার করছি আর এর জন্য অনুশোচনার সর্বনিম্ন অনুভূতিটিও যেন ক্রমশ আমাদের থেকে লোপ পাচ্ছে!

সময়ের অপচয় মানেই হল জীবনের অপচয়। জীবনকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে না পারার কারণেই অমূল্য সময় নষ্ট করা হয়।

এক তো হল সময় মত কাজ না করার ক্ষতি। আরেক হল, প্রয়োজনীয় ও জরুরী কাজ তো করাই হল না, ক্ষতিকর কাজ করে সময়কে অতিবাহিত করা হল; ক্ষতির উপর ক্ষতি!

আমাদের হায়াতের একটা সীমা আছে। জীবনের একটা সমাপ্তি আছে। হায়াতের মাঝে কোন কোন কাজ যদিও একাধিক বার করার সুযোগ থাকে বা আসে, বেশির ভাগ কাজ কেবল একবারই করার সুযোগ থাকে। যে কাজগুলো একাধিক বার করার সুযোগ হয়, সেগুলি প্রথম সুযোগে না করে পরবর্তীতে সুযোগে করলে কাজের গুণগত মান অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হয়; এর নেতিবাচক প্রভাব আবার অন্যান্য কাজেও পড়ে! সীমাবদ্ধ সময়ের এই জীবনে পরিণতির চিন্তা যারা করে না, তারাই আগামীদিনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে প্রতারিত হয়। কোন যৌক্তিক ওজর ব্যতীত – ‘একটু পরে করব’, ‘কালকে করব’, ‘এখন ভাল লাগছে না’ ইত্যাদি কথার ফেরে পড়ে জরুরী কাজকে যারা পিছিয়ে দেয়, তাদের না জাগতিক উন্নতি হয় না পরকালীন উন্নতি।

আমাদের সলফে সালেহীন (নেককার পূর্বসূরীগণ) জাগতিক ও পরকালীন – উভয় উন্নতিই করেছেন সময়ানুবর্তী হয়ে। আমরা উভয় জীবনে ক্ষতি যুক্ত করছি সময়কে অপচয় করে!

সমকালীন এক আলেমে-দ্বীন মূল্যবান কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘(আমার ছাত্রদের) কেউ কেউ আমাকে বলে, ‘হুজুর! সময়ে বরকত পাচ্ছি না, চেষ্টা করছি,দুআ করুন’ – এই আফসোস শুনে ভাল লাগে। শুকরিয়া আদায় করি – আলহামদুলিল্লাহ! সময়কে মূল্যায়ন করার মতন লোক দুনিয়াতে এখনো বাকি আছে!’

সময়ের অপচয় হয়ে গেলে আমাদের কি কমপক্ষে একটু আফসোস হয়? অমূল্য সময়কে হেলায় হারিয়ে সামান্য আফসোসও যদি না হয় সংশোধন আর কবে হবে?! যদি কিছুটা আফসোসও বাকি থাকে তাহলে স্বীকার করতে হবে এটা নেয়ামত। এর যথার্থ মূল্যায়ন না করলে নেয়ামত হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা আছে। অতএব, ‘এই অনুভূতি এখনো বাকি আছে’ এর উপর শোকর আদায় করা জরুরী। আল্লাহ তা’আলার কাছে যথাশীঘ্র তওবা করে সংশোধনী পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। সময়ের যথার্থ ব্যবহার করে জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনয়নে এখনি সচেষ্ট হয়ে যাওয়া উচিত।

যারা নামায আদায়ে যত্নবান, তাদের জন্য তো এত ‘ওয়াজ-নসিহত’ নিষ্প্রয়োজন। সময়ের গুরুত্ব তারা নামায দিয়ে বুঝে। নামাযকে কাযা করে পড়া আদায় তাদের কাছে পাহাড়সম কাজ! একজন নিয়মিত নামাযির কোন কারণে নামায কাযা হয়ে গেলে তার মন অস্থির হয়ে উঠে। কেন? কারণ ‘সময় মত পড়া হয়নি’।

শুধু একটু চিন্তা করুন! ভাবুন ঠান্ডা মাথায়। যার যে বিষয়ে বিশ্বাস স্থির হয়েছে, সে ঐ বিষয় সময় মত করাতে কোন ছাড় দেয় না। লাভ-ক্ষতির এক অজানা হিসাব মনের ভিতর সমানেই ঘুরপাক খাচ্ছে, সেখান থেকে ফল বের করে আনার প্রচেষ্টাও চলছে অবিরাম। আসলে কেউই থেমে নেই, কারণ থামার কোন অবকাশ নেই। ঘড়ির কাটার সাথে জীবনও বেগবান। হয় ভালর দিকে ধাবমান অথবা কোন মন্দের দিকে। কোন একদিকে চিন্তা-ফিকির ও প্রচেষ্টা চলছেই আর সময় যেন সবকিছুকে গ্রাস করে নিচ্ছে! কবি বলেন,

সাবধান! সময়ের চোরা-বালিতে পড়েছ তুমি,

কাজ করে যাও — পড়তে পড়তে কবরই ভূমি।

 

তাই কখন কী করা দরকার, কী করা হয়েছে, কী করা হচ্ছে – নিয়মিত এই মুহাসাবা (নিজের হিসাব নেয়া) জরুরী। শুধু নামায নয়, মুমিন প্রতিটি কাজ সময় মত করার চেষ্টায় রত থাকবে। তার জানা আছে যে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী হায়াত আখেরাতের অনন্ত পুঁজি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *